অর্থনৈতিক সংকটের স্বীকৃতি, ধীরে উত্তরণের আশা

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৫, ০৮:০০

এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর স্বীকৃতি মিলেছে। সাধারণ মানুষ যে উচ্চমূল্যস্ফীতিতে কষ্টে আছেন সেটি স্বীকার করে নিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে গত দুই বছর ধরে মানুষের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বাজেটে মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর উদ্যোগগুলো সীমিত। করমুক্ত আয় সীমা বৃদ্ধির সুবিধা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাওয়া যাবে না। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে এই সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন অর্থ উপদেষ্টা। কর কাঠামোতে যে পরিবর্তন এনেছেন তাতে গৃহস্থালি খরচ কিছুটা হলেও বাড়ছে। বাজেট বক্তৃতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নাগরিক সুবিধা, কর্মসংস্থানে জোর দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। তবে এবারের বাজেটের কর কাঠামোতে দেশীয় শিল্পে সুরক্ষা কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্য ভাবাচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, শ্রমিক অসন্তোষ প্রশমিত করে শিল্প খাতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনাই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থ উপদেষ্টা তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, মাত্র অল্প কয়েক মাসে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে স্থিতিশীল করার কাজটি প্রায় সম্পন্ন করে আনা সম্ভব হলেও পরিপূর্ণ সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে আমাদের এখনো অনেকটা পথ পেরোতে হবে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা দেখা গেলেও তা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন, গত এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কের নেতিবাচক প্রভাবও আমাদের অর্থনীতির ওপর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, সম্প্রতি যে বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় হার চালু করা হয়েছে, তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব আপাতত বাজারের ওপর পড়ার সম্ভাবনা না থাকলেও, এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে। এ সকল ঝুঁকি মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বৈষম্যহীন ও টেকসই ভিত্তি নিশ্চিত করা এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভিন্ন বাস্তবতায় এবার সংসদের বাইরে বাজেট উপস্থাপন করা হলো ভিন্ন আঙ্গিকে। সংসদ না থাকায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট এবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভিসহ অন্যান্য বেসরকারি গণমাধ্যমে একযোগে প্রচার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকাল ৩টায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বাজেট বক্তব্য সম্প্রচার করা হয়। জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‌‘যে স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান হয়েছে আমরা তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য আবাসস্থল রেখে যেতে চাই। আমরা মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে আমূল উন্নতি ঘটাতে চাই। আমরা এই লক্ষ্যগুলোকে মাথায় রেখে এই বছরের বাজেট সাজানোর চেষ্টা করেছি’।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তবর্তী সরকারের লক্ষ্যেও পরিবর্তন এসেছে। গতানুগতিক প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেট ব্যতিক্রমধর্মী। দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো বিগত বাজেটের চেয়ে ছোট আকারের বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থ উপদেষ্টা। এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয়’। বাজেট বক্তৃতায় সংস্কারের বিভিন্ন কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা। মধ্য মেয়াদে নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের আর্থিক খাত এখন তীব্র চ্যালেঞ্জে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনাদায়ী ঋণ (এনপিএল) বেড়ে যাওয়া, কিছু ব্যাংকের দুর্বল অবস্থা এবং চলমান তারল্য সংকট। প্রস্তাবিত বাজেটে নানা সমস্যার বিষয় উঠে এসেছে। বিগত সরকারের সময়ে অব্যবস্থাপনা, গত বছরের অপ্রত্যাশিত বন্য অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ ডেকে আনে। এর পরও বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো,  নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যে শুল্ক হ্রাস স্বস্তি দেবে।

বাজেটের আকার: প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার কমছে ৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এটি ছিল জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি: বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির গড় হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাজেটের আয় যেভাবে আসবে: বাজেটে রাজস্ব প্রাপ্তি কর থেকে আয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর ও এনবিআর বহির্ভূত করের মাধ্যমে আয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। আর এনবিআরবহির্ভূত কর থেকে আয় আসবে ১৯ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও কর ছাড়া প্রাপ্তি আসবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটের ঘাটতি যেভাবে পূরণ করা হবে: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মোকাবিলায় অর্থায়নের উৎস হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদান। বাজেট ঘাটতি পূরণে আগামী বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন: গতকাল সোমবার সকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ বৈঠকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অর্থ বিল অনুমোদন করা হয়। সেই সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুমোদন হয়। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও অন্যান্য উপদেষ্টাগণ উপস্থিত ছিলেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পাশ হবে ৩০ জুন। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন অর্থবছর। বাজেট অধিকতর অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইটে বাজেটের সব তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলসমূহ পাওয়া যাচ্ছে। যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসব দলিল পড়তে ও ডাউনলোড করতে পারবেন। এছাড়া দেশ ও বিদেশ থেকে যে কেউ বাজেট নিজস্ব সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশ দিতে পারবেন। ই-মেইলের মাধ্যমে মতামত ও সুপারিশ দেওয়া যাবে।

ইত্তেফাক/এমএএম