মায়াবতী ঝরনায় একদিন

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৯, ১৯:৪২

টিং টিং করে কী যেন বেজে চলেছে। ঘুম ঘুম চোখে ঘড়ির অ্যালার্ম বন্ধ করলাম। হঠাত্ মনে পড়ল, আমাদের তো আজ বাইরে বের হওয়ার কথা। বাইরে তখন মুষল ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করছে না। এরমধ্যে খুরশেদ ভাইয়ের ফোন এল, ‘স্যার, ঘুম থেকে উঠেছেন? ঘুরতে যাবেন না?’ আর দেরি না করে ঝটপট বিছানা থেকে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। আগের দিন আমার ব্যাংকের পার্টি খুরশেদ আলম ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, ক’দিন অফিসে কাজের খুব চাপ গিয়েছে, তাই আর ঘরে বসে থাকতে মন চাইছে না। তখন তিনি বললেন, ‘চলেন আমাদের জাফলংয়ে।’ বললাম, ‘অনেকবার গিয়েছি জাফলংয়ে।’ তিনি বললেন, ‘জাফলংয়ে গিয়েছেন ঠিক আছে, কিন্তু আপনাকে জাফলংয়ের এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে গেলে কাজের যে চাপ গিয়েছে, তা ভুলে যাবেন।’ আমি আর ‘না’ বললাম না।

সকাল সাতটায় আমরা গাড়িতে চেপে বসলাম। সিলেট শহরের বন্দরবাজার হয়ে মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। এদিকে পেটে রাম-রাবণের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি, খুরশেদ ভাইকে জানালাম। তিনি বললেন, ‘আর একটু সামনে যাই, আপনাকে স্পেশাল রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাব। সেখানে এমন খাবার পাবেন, যা ঢাকায়ও খুঁজে পাবেন না। ঢাকার মানুষও এখানে আসেন খাবার খেতে।’ মনে মনে ভাবলাম, কী আর এমন খাবার আছে, যা ঢাকায় পাওয়া যায় না—আজাইরা মন ভোলানো কথা! এরপর সামনে যখনই কোনো রেস্টুরেন্ট দেখি, তখনই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি খুরশেদ ভাইয়ের সেই স্পেশাল রেস্টুরেন্ট। আমরা হরিপুর বাজারে এসে পড়েছি। এদিকে ক্ষুধায় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার পথে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কত দূরে আপনার স্পেশাল রেস্টুরেন্ট?’ খুরশেদ ভাই বললেন, ‘আর দুই মিনিট।’ অবশেষে আমাদের গাড়ি থামলে দেখি, মূল রাস্তা থেকে নিচে একটা খুপরি ঘর। সঙ্গে দুটো টেবিল আর বেঞ্চ পাতা। হতাশ মনে ভাবলাম, এটা স্পেশাল রেস্টুরেন্ট! খুরশেদ ভাই আমার অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, ‘আগে নাস্তা করেন, দেখেন কী খাবার আছে।’ দোকানে গিয়ে বসলাম। দেখলাম, একজন বৃদ্ধ মহিলা কী যেন রান্না করছেন আর বেশ সুন্দর গন্ধ বের হয়েছে। একটু পরে আমাদের টেবিলে খাবার এসে হাজির হলো। হোটেলের সামনে ডিপ টিউবওয়েলে হাত ধুয়ে বসে পড়লাম খেতে। চালের গুঁড়ার রুটি আর মুরগির মাংস। সঙ্গে হরিপুরের বিখ্যাত লেবু। প্রথমে একটু খারাপ লাগছিল হোটেলের পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা নিয়ে। পরে খাবার মুখে দিয়ে সেই খারাপ লাগাটা দূর হয়ে গেল। অসাধারণ স্বাদ! দেশি মুরগির মাংসের তরকারি। আর এতে ব্যবহার করা হয়েছে বাটা মসলা। আমরা যারা শহুরে, সাধারণত সবাই গুঁড়া মসলার ওপর নির্ভরশীল। শেষ কবে যে বাটা মসলায় রান্না করা খাবার খেয়েছি, তা হয়তো আমরা মনেই করতে পারব না।

নাস্তা শেষ করে রওয়ানা দিলাম গন্তব্যের দিকে। জাফলংয়ের কাছে পৌঁছাতেই দেখা মিলল পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝরনা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। বর্ষাকাল বলে পার্শ্ববর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্যের আকাশ ছোঁয়া খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়গুলো সবুজে ভরে উঠেছে। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে ভারতের সীমান্তঘেঁষা দেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের এই জনপদকে। জাফলংয়ের বল্লাঘাটে এসে পৌঁছালাম। তারপর নৌকায় নদী পার হয়ে এগিয়ে চললাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে। নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি। খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। এই পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর। প্রতিটি বাড়িতে পানবরজ আছে। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষেরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন। আর বাড়ির উঠোনে বসে নারী সদস্যরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য। পান পাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য সবারই নজর কাড়ে। আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যর উংশিং পুঞ্জির পাশ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে এই ঝরনা। আকাশে তখন ছাইবরণ মেঘমালা খানিক পর পর আকার বদলাচ্ছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা ছুটেতে চলেছে অজানায়। আমরা ঝরনার একদম কাছে গিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটাতে থাকলাম। বেশ পর্যটকের আনাগোনা দেখলাম। প্রকৃতির আপন মহিমায় গড়ে ওঠা এই সৌন্দর্যের কাছে এলে শত শ্রান্তি, ক্লান্তি ও বিষাদে ভরা মন-প্রাণ নিমিষেই জুড়িয়ে যায়। তবে বলে রাখা ভালো, সাহস দেখিয়ে অনেকেই ঝরনার শেষ সীমানা পর্যন্ত যেতে চান, যা খুব বিপজ্জনক। কারণ চারপাশে বড় বড় পাথরের বোল্ডারের ওপর থেকে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ও আরেকটা কথা, আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার, তাই দয়া করে পানির বোতল, প্লাস্টিকের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলবেন না।  

কিভাবে যাবেন

 

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে সিলেটে যেতে ভাড়া পড়বে ২৫০ থেকে ১২০০ টাকা। সিলেট থেকে লোকাল বাসে জাফলং মামার বাজার। ভাড়া ৬০ টাকা। অথবা গাড়ি রিজার্ভ করে যেতে পারেন। ভাড়া নেবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। জাফলং বল্লাঘাট থেকে ১০ টাকা দিয়ে পিয়াইন নদী পাড় হয়ে খাসিয়া পুঞ্জি যেতে হবে। সেখান থেকে রিকশা বা শ্যালো ইঞ্জিন চালিত গাড়িতে করে সংগ্রাম পুঞ্জির অপর প্রান্তে নামলেই মেঘালয় পাহাড় দেখতে পাবেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে আধা কিলোমিটার হাঁটলেই শুনতে পাবেন ঝরনার গর্জন। অথবা জাফলং বল্লাঘাট থেকে টুরিস্ট নৌকা করে যেতে পারেন।