বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস চর্চায় ব্যক্তিপূজার অন্ধপ্রলয় ঠেলে নির্লোভ, নিরহঙ্কারী, নির্মোহ, নিষ্ঠাবান মানুষদের খুঁজে বের করা এক কঠিনতর কাজ। এই লড়াই শাশ্বত এবং কাজটিও সহজ নয়। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে মেধা-প্রজ্ঞা-সততা আর সংগ্রামের মিশেলে এরকম রাজনীতিকদের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। বিপরীত স্রোতে চলা লক্ষ্যভেদী তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন এই বিরলপ্রজ রাজনীতিকদের একজন।
তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ২৩ জুলাই, ১৯২৫ সালে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে। বাবার নাম মৌলভী মো. ইয়াসিন খান, মায়ের নাম মেহেরুননেসা খান। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি ১৯৪৪ সালে ম্যাট্টিকুলেশন পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে দ্বাদশ স্থান এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি রাখেন অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর। ১৯৬৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার, যা মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত, সেই সরকার গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কঠোর আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাবের কারণেই তাজউদ্দীন আহমদ পরিণত হয়েছিলেন একজন আপসহীন নেতায়। সত্তরের দশকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যে কর্মচঞ্চলতা সৃষ্টি হয়েছিল তথা আওয়ামী লীগ যে এদেশের সিংহভাগ মানুষের ব্যাপক জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছিল তার পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্ব এবং তাজউদ্দীন আহমদের সাংগঠনিক কর্মধারা। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের থেকে তাঁর পেছনে ফাইল বহনকারী ব্যক্তিটি (তাজউদ্দীন আহমদ) একদিন পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।’ ভুট্টোর এই আশঙ্কা একদিন সত্যি প্রমাণিত হলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও তাজউদ্দীন আহমদের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং প্রবাসী সরকারের অন্য নেতারা বঙ্গবন্ধুর সেই অনুপস্থিতির অভাব অপূরণ রাখেননি।
তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বের আরেক বড় গুণ হলো অনুপস্থিত নেতা বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদী অবস্থান কখনো খাটো হতে দেননি। মুক্তিযুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে এককভাবে নেতৃত্বের সুযোগ পেয়েও তিনি নিজের কোনো প্রবল প্রতাপান্বিত ভাবমূর্তি গড়ে উঠতে দেননি। বরং বঙ্গবন্ধুর একান্ত অনুসারী ও অনুগামী হিসেবেই, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁরই পক্ষে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রতীক্ষা যেমন সমগ্র জাতি করেছে, তেমনি তিনি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের কৃতিত্ব তাঁর তো অনেকখানিই পাওনা। তিনি যুদ্ধপর্বে ব্যক্তিগত কৃচ্ছ্রর অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু সবই একান্তে, নিজের মতো করে।
বঙ্গবন্ধুর মতোই নিলোর্ভ সাদামাটা জীবনযাপন করতেন বাঙালির এই মহান নেতা। তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি বাঙালি জাতির রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। শেষের দিকে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন, যা নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল কত কল্পকাহিনিই না রচনা করে ব্যর্থ হয়ে নীরব হয়ে গেছে। মূলত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর হূদয়ের দিক থেকে কোনোদিন বিচ্ছিন্ন হননি, জীবন দিয়ে তাই তিনি প্রমাণ করে গেছেন। আজ তাঁর ৯৪তম জন্মদিন। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
