বাংলাদেশের আধুনিক কালের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের একটি কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম হইল—‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। আজ সারাদেশ জুড়িয়া যে, হারে গুজব ছড়াইয়া পড়িতেছে এবং গণপিটুনিতে দোষী-নির্দোষ মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়িতেছে তাহাতে নির্দ্বিধায় বলা যায়—‘অদ্ভুত গুজবের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বারংবার সাধারণ মানুষকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলিতেছেন যে কেহ গুজবে কান দিবেন না। তাহারা এইজন্য মাইকিং করিয়া বেড়াইতেছেন। কিন্তু কে শোনে কাহার কথা! শামসুর রাহমান তাহার ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতায় গুজবের ডালপালা ছড়াইবার পর প্রকৃত পরিস্থিতি তুলিয়া ধরিয়াছেন এইভাবে—‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।’ আমরা কেহ কানে হাত দিতেছি না, চিলের পিছেই অযথা ছুটিয়া বেড়াইতেছি। ‘পদ্মা সেতুতে শিশুর কাটা মাথা লাগিবে’—এই কথা কি কোনো আধুনিক শিক্ষিত মানুষ বিশ্বাস করিতে পারেন? ছেলেধরা সন্দেহে খোদ রাজধানী ঢাকার একটি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করিতে যাওয়া একজন মাকে কীভাবে পিটাইয়া হত্যা করা যায়? নিজের মেয়েকে আদর করিবার সময় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের একটি স্কুলে কিভাবে পিটাইয়া হত্যা করা যায় একজন বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবাকে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি হইতে যেখানে জ্ঞানের আলো ছড়াইবার কথা, সেইখানে কেন এখনো কুসংস্কারের ভূত দূর হইতেছে না? আমাদের এত উন্নয়ন ও অগ্রগতি কি তাহা হইলে বৃথা যাইবে?
গত কয়েক দিন ধরিয়া ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে দেশে যেন গণপিটুনির হিড়িক পড়িয়া গিয়াছে। কি শহর কি গ্রাম সবখানে আইন হাতে তুলিয়া নিবার প্রবণতা বাড়িতেছে ন্যক্কারজনকভাবে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী কমলগঞ্জ ও সাভারে গণপিটুনিতে দুই জন নিহত হইয়াছে। সাত জেলায় আহত হইয়াছে আরো ১৩ জন। ইহার আগের দিনে দেশে নারীসহ নিরপরাধ তিন জন গণপিটুনিতে নিহত হন। এই পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। স্রেফ গুজবের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ছেলেধরা সন্দেহে ৬৫ বত্সরের এক জন বৃদ্ধাকেও গণপিটুনি দিতে আমাদের হাত কাঁপে নাই। অথচ পরে জানা যায় এই বৃদ্ধা আসলে ভিক্ষুক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে এক যুবক পাশের গ্রামের এক বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্ করিতে গিয়াছিল। ছেলেধরা বলিয়া জাপটাইয়া ধরিয়া তাহাকেও গণপিটুনি দেওয়া হইয়াছে।
ছেলেধরার গুজবে দেশে গণপিটুনির ঘটনা যেইভাবে বাড়িতেছে তাহাতে প্রতিবন্ধী, অপ্রকৃতিস্থ ও অচেনা বেশভূষার মানুষজন সন্দেহভাজন হিসাবে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়িয়াছেন। অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ ও চর্চায় আমাদের এই উপলব্ধি হওয়া উচিত—বিনা বিচারে যে কাউকে হত্যা করা অন্যায়। এইক্ষেত্রে সন্দেহভাজন অপরাধীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করাই নিয়ম। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করিবার পরও অনেক সময় দেখা যায় সুবিচার পাওয়া যায় না। এই কারণে হতাশ জনতা অকুস্থলেই দোষী বা সন্দেহজনক ব্যক্তি শাস্তি দিতে উঠিয়াপড়িয়া লাগে যদিও ইহা আইনের পরিপন্থি ও একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মোটেও কাম্য নহে। অনেক সময় প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করিতে ‘গণপিটুনি’ নামক অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়, যাহা অত্যন্ত নিন্দনীয়। গণপিটুনিতে হত্যা সভ্যতা ও মানবতাবিবর্জিত অপরাধ। আমরা যেন নিজের ভিতর এক জন খুনিকে লালন না করি, সেই ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সচেতন হইতে হইবে।
