বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবারও পরিবর্তনের হাওয়া। বিসিবি সভাপতি থেকে শুরু করে মাঠের অধিনায়ক- সবকিছু ঘড়ির কাটার আগে পালটে যাচ্ছে। কেউ কোনো নিয়ম কিংবা আনুষ্ঠানিকতার ধার ধারছেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শ্রীলঙ্কা সফরের আগে এক সকালেই বদলে যাওয়া ওয়ানডে দলের নেতৃত্বের কথা। নাজমুল হোসেন শান্তকে সরিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজকে দেওয়া হলো অধিনায়কত্ব।
এই বদলে যাওয়ার খবরটি যতটা আকস্মিক, তার চেয়েও বেশি নীরব। কারণ এই পরিবর্তনের আগে শান্তর সঙ্গে বিসিবির ন্যূনতম আলাপও হয়নি বলে আভাস মিলেছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে। যদিও এ নিয়ে মুখ খোলেননি কেউই নেতৃত্ব হারানো শান্ত, না বিসিবির কোনো কর্তা। বিষয়টি জানেন নতুন অধিনায়ক মিরাজও। সেজন্য তিনি সবসময় সব ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত থাকেন। শুক্রবার সকালে মিরপুরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, 'অনেক কিছুই তো ঘটে, আমরা তো সবাই জানি সেগুলো কীভাবে ঘটে। সুতরাং আমরা সকলেই সবসময় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি।'
তবে নতুন দায়িত্ব পাওয়া মিরাজ ছিলেন স্পষ্ট, স্বতঃস্ফূর্ত এবং আত্মবিশ্বাসী। ড্রেসিংরুমে নেতৃত্ব বদলালেও দল বদলায় না বলে বিশ্বাস করেন তিনি। বদলায় না পারস্পরিক আস্থাও। 'আমার কাছে মনে হয় ড্রেসিংরুমে কোনো প্রভাব পড়বে না। শান্ত যখন অধিনায়ক ছিল, আমি তাকে সাহায্য করেছি। এখন আশা করি, সেও আমাকে সাহায্য করবে। আমরা একসঙ্গেই বাংলাদেশের জন্য খেলব,' বললেন মিরাজ।
নতুন অধিনায়ক জানালেন, তার কাছে নেতৃত্ব বড় নয়, দল বড়। বললেন, এখন সময় এসেছে ওয়ানডে দলটিকে গড়ে তোলার। এক বছরের ভেতরে তিনি চান এই দল হোক পরিপূর্ণ, সাহসী হোক, আত্মবিশ্বাসী হোক। এ দিকে বিসিবি অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছে মিরাজের নেতৃত্ব নিয়ে। ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিম মিরাজকে বলেছেন, 'এই ক্রান্তিকালে দলকে প্রেরণা জোগানোর জন্য মিরাজের মতো নেতারই প্রয়োজন ছিল। আমরা বিশ্বাস করি, সে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।'
এই দায়িত্বের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট আবারও পেল তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়ক। টেস্টে শান্ত, টি-টোয়েন্টিতে লিটন এবং এখন ওয়ানডেতে মিরাজ। একসঙ্গে পথচলার বার্তাই হয়তো তাই শান্ত দিয়েছেন নিজের ফেসবুক পেজে, 'নতুন পথচলায় শুভকামনা মেহেদী মিরাজ।'
মিরাজের অভিষেক হয়েছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার অধীনে, আর এখন নিজেই হয়ে উঠেছেন নেতা। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মিরাজ বলেন, 'আমি অনেক অধিনায়কের অধীনে খেলেছি। দেখেছি তারা কীভাবে কঠিন সময়ে শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে শেখা জিনিসগুলোই এখন কাজে লাগাতে চাই।' আবার এটিও বলেছেন, 'অনেক সময় সিদ্ধান্ত পক্ষে আসবে না, কিন্তু কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি সেটাই আসল।'
তরুণদের উদ্দেশ্যেও একটাই বার্তা দিয়েছেন নতুন অধিনায়ক- 'পারফর্ম করতে হবে, সাহস নিয়ে খেলতে হবে আর সেই সঙ্গে দিতে হবে ভালোবাসা, তৈরি করতে হবে এমন এক ড্রেসিংরুম, যেখানে কেউ একা নয়। যেখানে প্রত্যেকে অনুভব করবে, 'আমার পাশে আমার দল আছে।'
এ দিকে সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের সঙ্গেও মিরাজের আলোচনা হয়েছে সম্প্রতি পিএসএলে একসঙ্গে খেলার সময়। সেই প্রসঙ্গ টেনে মিরাজ বলেছেন, 'আমরা একসঙ্গে পিএসএল খেলেছি। তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সাকিব ভাই ভা মন থেকে চান বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। বলেছেন, তরুণরা যেন ভালো খেলে এবং দল হিসেবে যেন সবাই একসঙ্গে পারফর্ম করে। কারণ, বাংলাদেশ দল যখন একসঙ্গে পারফর্ম করে, তখনই সাফল্য আসে।'
নতুন অধ্যায়ের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী ও পরিষ্কার বার্তার মাধ্যমে নেতৃত্বের যাত্রা শুরু করলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। শ্রীলঙ্কা সফরের মধ্য দিয়ে সেই হাঁটা শুরু হচ্ছে। মিরাজ এখন শুধু অলরাউন্ডার নন, ওয়ানডে দলের দিশারি। এখন মাঠে নামার পালা তিন ফরম্যাটে তিন নেতৃত্বের দেশ আবারও তাকিয়ে থাকবে একটি লক্ষ্যেই, সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্পে এই নতুন অধ্যায় কতটা উজ্জ্বল হয়। পেছনে শঙ্কা রয়েছে, শান্তকে যেভাবে সরিয়ে দেওয়া হলো, মিরাজকেও সেভাবে সরানো হবে নাতো, এই বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও মিরাজের ভাষায় কিছু বার্তা রয়েছে।
তিনি বলেছেন, 'এটা সম্পূর্ণ বোর্ডের ব্যাপার, তারা কীভাবে চিন্তা করছে। এখন দল যেহেতু খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে ভুগছে, হয়তো সে কারণে বোর্ড চিন্তা করছে, এক বছরে ওয়ানডে দল একটা জায়গায় যেন পৌছায়, তার পরে হয়তো পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবে। আগামী এক বছরে যেহেতু অনেকগুলো ওয়ানডে ম্যাচ হবে, সেহেতু তার ওপরে হয়তো নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত। এখন সময় এসেছে দলকে একটি জায়গায় দাঁড় করানো।'
