লোহার রড নিয়ে এক নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জাফর পাটোয়ারি। এক নাগাড়ে অন্তত ২০/২৫ বার আঘাত করে। গণপিটুনির শিকার তাসলিমা বেগম রেনু কয়েক দফা চিত্কার করার পর নিস্তেজ হয়ে পড়েন। জাফরের মাথায় রক্ত চড়ে বসে। তার সঙ্গে আকলিমা নামে এক নারী রেনুকে অনবরত লাথি মারেন। এরপর নারীদের বেষ্টনী থেকে রেনুকে আকলিমাই তুলে নিয়ে পুরুষদের কাছে ফেলে দেয়। সেখানে হূদয় নামে এক যুবক লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। পেটাতে পেটাতে হূদয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম মো. তোফাজ্জাল হোসেনের আদালতে আসামী জাফরের দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমনই বর্ণনা উঠে এসেছে। আদালতে জাফর যখন এই বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন অনেকের চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। জাফর পাটোয়ারির বাবা ইয়াসিন পাটোয়ারি উত্তর বাড্ডার ভাই ভাই হোটেল অ্যান্ড রেষ্টুরেন্টের মালিক। জাফর খিলক্ষেতে রেসিডেন্সিয়াল ল্যাবরেটরি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তিন আসমিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মন্ডল চার দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন। রিমান্ডকৃত আসামিরা হলেন- বরগুনার তালতলী উপজেলার গাবতলী হাওলারদার বাড়ির বাসিন্দা শাহীন (৩১), ময়মনসিংহের ধোবাউরা উপজেলার দরশা গ্রামের বাসিন্দা বাচ্চু মিয়া (২৮) ও উত্তর বাড্ডা কাঁচা বাজারের ফারুকের মুদি দোকানের কর্মী বাপ্পী (২১)।
বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, গণপিটুনিতে নেতৃত্ব দেয়া আরো ১৬ জনকে আমরা ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করেছি। এদের মধ্যে হূদয় ও আকলিমা বেগম নামে দু’জনকে আটকের জন্য অভিযান চালানো হয়েছে। গতকাল জাফর পুলিশের কাছে এই গণপিটুনিতে নেতৃত্ব দেয়ার বিস্তারিত কাহিনী জানিয়েছে। জাফর পুলিশকে বলেছে, পদ্মা সেতুতে শিশুর কাটা মাথা লাগবে-এমন তথ্য ফেসবুকে সে দেখেছে। এমনকি রাজধানীতে ছেলেধরা আতংক চলছে-সেটাও জানে। শনিবার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে সে উত্তর বাড্ডার মসজিদ রোডের বাসায় ছিল। এসময় বাহির থেকে চিত্কার চেঁচামেচি শুনতে পায়। বাসা থেকে বের হয়ে দেখতে পায় যে মহল্লার অনেকেই ছেলেধরা ধরা পড়েছে-এমন কথা বলতে বলতে প্রাইমারি স্কুলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। সেও স্কুলের দিকে ছুটে যায়। স্কুলের নীচতলায় ফাঁকা জায়গায় এক নারীকে অনেক নারী ঘিরে ধরে কিল ঘুষি মারতে দেখে। সে পাশে পড়ে থাকা একটি লোহার রড হাতে নিয়ে ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢোকে। এক নারী চিত্কার করছে, ‘আমারে মাইরেন না। আমি ছেলেধরা না।’ এ কথা শুনতে শুনতে জাফর লোহার রড দিয়ে ওই নারীকে পেটাতে থাকে। অনবরত পেটাতে পেটাতে এক পর্যায়ে ওই নারী নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তখন অন্য নারীরাও তাকে লাথি মারতে থাকে। প্রায় ২৫/৩০ মিনিট পর পুলিশ আসে। ছেলেধরাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে-এমন বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিজেকে খুব হিরো হিরো লাগে। দুপুরের পর বাসায় ফিরে আসে। রাতে টিভি চ্যানেলে দেখতে পান যে ওই নারী ছেলেধরা ছিলেন না। তার বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে এই নির্মম ঘটনা সে ঘটিয়ে ফেলেছে। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগে।
