তথাকথিত ‘ছেলেধরা’দের শায়েস্তা করতে দেশে যে বিপজ্জনক অপচর্চা শুরু হয়েছে, বিভিন্ন মহল থেকে সতর্কতা এবং আইন হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান সত্ত্বেও তা অব্যাহত আছে। গত কয়েক দিন গণপিটুনিতে বেশ কয়েক জন নিহত ও আহত হয়েছে। গতকাল বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, ১২ জেলায় আরো ২২ জন নারী-পুরুষ ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছে।
এদিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ও খোলামুড়া এলাকায় পর পর দুই দিন গণপিটুনি দিয়ে দুই জনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ৪০০ জনকে আসামি করে থানায় দুটি মামলা দায়ের করেছে। পৃথক ঘটনায় আরেকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন। সন্দেহ হলেই কাউকে পিটুনি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন জেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা অব্যাহত আছে। ইত্তেফাকের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্র ‘ছেলেধরা’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনিতে আক্রান্ত হবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অনেকে এই গুজবে বিশ্বাস করে সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আবার অনেকে মিথ্যা গুজবের খপ্পরে নিজেরাই কখন গণপিটুনির শিকার হবেন সেই আতঙ্কে আছেন। বন্ধুর প্রেমিকাকে তার বাড়িতে মোবাইল ফোন ও প্রেমপত্র পৌঁছে দিতে গিয়ে বসন্ত শব্দকর (২৪) নামের এক যুবক রবিবার রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার হাজীপুর ইউনিয়নের পীরেরবাজার এলাকার খাতাইরপার গ্রামে গণপিটুনির শিকার হয়েছে। পুলিশ উত্তেজিত জনতার হাত থেকে ঐ যুবককে উদ্ধার করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে জনগণকে সতর্ক করা ছাড়াও মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিদের এই সচেতনতামূলক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জের ছাতকে ছেলেধরা সন্দেহে ৫৫ বছর বয়সের এক ব্যক্তিকে গণপিটুনির পর পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে রবিবার বিকালে। সদর ইউনিয়নের মল্লিকপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। একই দিন রাতে জামালগঞ্জ উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে আরো এক মানসিক প্রতিবন্ধী যুবক আফজাল হোসেন (২৬) গণপিটুনির শিকার হন। সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জানান, ইতিমধ্যে জেলার সবকটি থানায় মাইকিং করে এসব বিষয়ে সচেতনতার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ছেলেধরা সন্দেহে দুই জনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। উপজেলার বিশণন্দী ইউনিয়নের কড়ইতলা ও দড়িসিঙ্গারপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে উপজেলার হাইজাদী ইউনিয়নের দড়িসিঙ্গারপুর এলাকায় ব্রিজের ওপর মানসিক প্রতিবন্ধী এক মহিলাকে ছেলেধরা সন্দেহে আটক করে গণপিটুনি দেয় জনতা। অপরদিকে কড়ইতলা গ্রামে মোতালিব নামের আরেক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে কিছু লোক।
অন্যদিকে, রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাওথা এলাকায় সোমবার দুপুরে অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তি একটি এনজিও’র নামে সদস্য সংগ্রহ করছিল। এমন সময় এলাকাবাসী ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পাঁচ জন হচ্ছে গোপালগঞ্জ জেলার মকসুদপুর উপজেলার ঝাকরপুর গ্রামের মসলেম উদ্দিনের ছেলে হাফিজুর রহমান, একই এলাকার আলহাজ আখতারুজ্জামানের ছেলে আবুল হোসেন, একই এলাকার লুত্ফর রহমানের ছেলে রেজাউল করিম, ঢাকা দক্ষিণের লালবাগ থানার আব্দুল মজিদের ছেলে কাইয়ুম আলী এবং একই এলাকার আবুল কালাম।
এছাড়া, জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ছেলেধরা সন্দেহে রুবেল মিয়া (৩২) নামে এক ভবঘুরে যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে জনতা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে। রবিবার উপজেলার পোগলদিঘা ইউনিয়নের কান্দারপাড়া বাজার জামে মসজিদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পৃথক ঘটনায় নাটোরের সিংড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে আলী আহমেদ (৪০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন প্রতিবন্ধীকে মারপিট করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা। রবিবার রাতে উপজেলার মহেশচন্দ পুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আটককৃত আলী ফেনী জেলার সদর থানার আবুল খায়েরের পুত্র।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জের অলিপুরে ছেলে ধরা সন্দেহে ৩ ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে তাদের আটক করা হয়েছে। গণপিটুনিতে গুরুতর আহত তিন জনকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন জন হচ্ছে, মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া কাশিপুর গ্রামের তোরাব আলীর পুত্র মোখলেছ মিয়া (৩২), একই এলাকার রতনপুর গ্রামের আব্দুর রহিমের পুত্র গিয়াস উদ্দিন (৩২) ও বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার হাবিবপুর গ্রামের শাহেদ মোল্লার পুত্র সিরাজুল ইসলাম (৩০)।
এর বাইরে নোয়াখালীর সেনবাগের ছমিরমুন্সিরহাট এলাকায় এক স্কুলছাত্র তার মায়ের বোরকা পরে বাজারের ঘুরতে গিয়ে ঈছলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছে। তার নাম আরিফুল হক ইয়াছিন (১৫)। সে উপজেলার কাবিলপুর ইউনিয়নের ইয়ারপুর গ্রামের আবদুল হকের পুত্র এবং স্থানীয় ইয়ারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। রবিবার স্কুল ছুটির পর আরিফুল তার মায়ের বোরকা পরে একটি সিএনজি অটোরিকশাতে উপজেলার ছমিরমুন্সিরহাট বাজারের যায়। তার হাঁটাচলায় লোকজনের মধ্যে সন্দেহ হয়। তারা তাকে চ্যালেঞ্জ করলে সে এলোমেলো কথাবার্তা বলে। তাকে ছেলে বুঝতে পেরে উপস্থিত লোকজন গণপিটুনি দেয়। এক লোক তাকে চিনতে পেরে তাকে রক্ষা করে।
এদিকে, সাভারে কোমল পানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এক তরুণীকে অচেতন করার সময় ছেলেধরা সন্দেহে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া এক দম্পতিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। গতকাল সোমবার দুপুরে পৌর এলাকার রাজাবাড়ী মহল্লায় এ ঘটনা ঘটেছে। গণপিটুনির শিকার ওই দম্পতি হচ্ছে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি থানার নালিগ্রাম এলাকার মো. মামুন (২২) ও তার স্ত্রী বিলকিস বেগম। অচেতন হওয়া কিশোরীর নাম রুমি আক্তার (১৭)। সে ঢাকার ধামরাই উপজেলার ফুটনগর গ্রামের মো. রমজান মিয়ার মেয়ে। রুমি বাবা-মায়ের সাথে পৌর এলাকার রাজাবাড়ি মহল্লায় ভাড়া বাসায় থাকত।
মেয়েটির বাবা মো. রমজান মিয়া জানান, ঘটনার সময় আমরা কেউ বাসায় ছিলাম না। মেয়েটি বাসায় একা থাকার সুযোগে এক মাস আগে আসা প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া দম্পতি রুমিকে কোমলপানীয়র সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার চেষ্টা করে। বিষয়টি বাড়ির সামনের এক দোকানি দেখে লোকজন নিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক নাজমুল হক বলেন, ধারণা করা হচ্ছে পরিচিত হয়ে খাতির জমিয়ে অচেতন করে বাসাবাড়ি থেকে মালামাল চুরি করে থাকে এই দম্পতি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের ভালুকায় দুই যুবককে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গতকাল থানায় মামলা হয়েছে। রবিবার রাতে উপজেলার হবিরবাড়ী আমতলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ তিন অভিযুক্তকে আটক করেছে।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে মারধর করা হয়েছে গতকাল সোমবার। তবে গুরুতর কিছু ঘটার আগেই পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়। দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের ছাদেকপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এছাড়া মাদারীপুরে একই সন্দেহে গাছে বেঁধে পিটুনি দেয়া হয়েছে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
বরিশালে পুলিশের মাইকিং : সম্প্রতি ছেলেধরা গুজবের খপ্পরে পড়ে বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহতর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আগৈলঝাড়ায় সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে বা আটক করলে তাত্ক্ষণিক থানা পুলিশে খবর দিতে মাইকিং করেছে আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ প্রশাসন। গতকাল দিনভর থানার পক্ষে মাইকিং করেন এসআই দেলোয়ার হোসেন।
গণপিটুনি থেকে প্রতিবন্ধী
নারীকে উদ্ধার করল পুলিশ
নরসিংদী জানান, নরসিংদী শহরের শেখেরচর বাজার সংলগ্ন আব্দুল্লাহ বাজারে সোমবার রাতে ছেলেধরা সন্দেহে জনতা এক প্রতিবন্ধী নারীকে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ খবর পেয়ে প্রতিবন্ধী নারীকে গণপিটুনি থেকে উদ্ধার করে। প্রতিবন্ধী ঐ নারীর নাম মালেকা বানু (৪৫)। তার বাড়ি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায়।
শেখেরচর পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ এস আই তানভীর আহমেদ বলেন, রাত ৮টার দিকে আব্দুল্লাহ বাজারে ঐ নারী উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। এ সময় আশেপাশের লোকজন ঘিরে ধরে তাকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করে পিটুনি দেয়। দিনাজপুরের বিরামপুরে তার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। মঙ্গলবার নরসিংদীতে এসে তার মাকে নিয়ে যাবেন।
