'বড় আশা করে এসেছি গো, কাছে ডেকে লও'-'রাজবধূ' সিনেমার এই বিখ্যাত গান হয়তো অনেকের মনে সুর তোলে আবেগে। কিন্তু জাতীয় দলের নির্বাচকদের কণ্ঠে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা যখন এই সুর বাজে, তখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় দায়বদ্ধতার প্রতিধ্বনি। এনামুল হক বিজয়ের ঘরোয়া ক্রিকেটে ঝলমলে পারফরম্যান্স দেখে নির্বাচকদের সেই বড় আশা ছিল একরাশ প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে তার ব্যাটে উঠছে শুধুই হতাশার সুর।
বিজয়ের ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিসংখ্যান তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে একাধিক সেঞ্চুরি, ফ্লুয়েন্ট ব্যাটিং, স্টোকমেকিং দক্ষতা-সবই ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ঘরোয়া নায়ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে 'অচেনা মুখ' হয়ে যাওয়াটাই যেন তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে প্রথম ইনিংসে 'ডাক', দ্বিতীয় ইনিংসে চার রান করেন বিজয়। কলম্বো টেস্টে আবারও শূন্য। আন্তর্জাতিক টেস্টে ফিরেই যেন পুরোনো কষ্টেরই পুনরাবৃত্তি। বিজয়ের সাম্প্রতিক টেস্ট ইনিংসের রান: ০, ৪, ০- যা একজন অভিজ্ঞ ব্যাটারের জন্য শুধু লজ্জাজনক নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের চূড়ান্ত ভাঙনের ইঙ্গিত।
২০১২ সালে দেশের জার্সিতে অভিষেক, মাঝে কয়েকটি ইনিংসে সম্ভাবনার ঝলক দেখালেও পায়ের নিচের মাটি কখনই শক্ত করতে পারেননি বিজয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে হরহামেশাই সেঞ্চুরি পাওয়া এই ব্যাটারের ব্যর্থতার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সবখানেই। 'বড় মঞ্চে মানসিক চাপ সামলাতে পারেন না', 'টেকনিক্যাল ঘাটতি রয়েছে', 'শট সিলেকশনে খামখেয়ালি'-বিশ্লেষকদের এ ধরনের পর্যবেক্ষণ আজ আর কেবল ভাষ্য নয়, বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন উঠছে-যখন বাংলাদেশ 'ম্যাচ জেতা'র জন্য দল সাজাচ্ছে, তখন এমন এক ব্যাটারকে একাদশে রাখা যার সাম্প্রতিক পাঁচ আন্তর্জাতিক ইনিংসে রান মাত্র ৪৩ (গড়ে ৮.৬০)-এটা কি ক্রিকেটীয় ন্যায়ের সঙ্গে মানানসই?
শুধু বিজয় নয়, নির্বাচকরা এবার ঘরোয়া পারফরম্যান্স দেখে ওয়ানডে স্কোয়াডে মোহাম্মদ নাঈম শেখকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। নাঈমের অতীত আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স খুব বেশি আশাজাগানিয়া নয়। ফলে প্রশ্নটা উঠছে স্বাভাবিকভাবেই-নাঈম কি হবেন আরেকজন 'ঘরোয়া তারকা, আন্তর্জাতিক হতাশা'? বাংলাদেশ দলের এখন দরকার হাই-পারফরম্যান্স ক্যাম্প থেকে কঠোর মানদণ্ডে ভিত্তি করে দল নির্বাচন।
ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করলেই জাতীয় দলে ঢুকে পড়ার এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। প্রতিভা থাকলেও বড় মঞ্চে সেই প্রতিভার মূল্যায়ন কীভাবে হয়, তা বোঝার জন্য প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা, আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি, আর সবচেয়ে বড় কথা-পারফরম্যান্স। বিজয় হয়তো ভালো মানুষ, বড় পরিশ্রমী। কিন্তু জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত ফর্ম ও ধারাবাহিকতা। আর সেখানেই বিজয়ের বিজয়কেতন অস্তাচলে।
