সানজানার অনন্য রেকর্ড

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৬

তিনি নিজে রক্ত দেন। রক্ত দিতে মানুষকে উত্সাহিত করেন। কারো রক্তের প্রয়োজন। তাকে বললেই হলো, ওমনি ম্যানেজ হয়ে যায়। রক্ত দানে ক্ষতি নেই বরং অন্যের উপকার। সেটাই বুঝাতে চেষ্টা করেন। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে তিনি রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন। ৪৩৯ জন মায়ের স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের কাজে সহযোগিতা করেছেন তিনি। চা শ্রমিকদের বিপদে আপদে তিনি ছুটে যান। তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সানজানা শিরিন সাঞ্জু। ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশনের হাসপাতালে কাজ করছেন মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট পদে। হাসপাতালটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে অবস্থিত। রক্ত সংগ্রহের তার মাধ্যম ফেসবুক। ঢাকার মিরপুরে কেউ আছেন। আজকে এক বাবার জন্য রক্ত লাগবে। এভাবে ফেসবুকে পোস্ট দেন। পরিচিতজনকে ফোন করেন। বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য রক্ত সংগ্রহে তার চেষ্টার শেষ নেই। ছোটো চাকরি, সামান্য বেতন। সীমাবদ্ধতার শেষ নেই। তবু সানজানা সমাজসেবায় কাজ করছেন। বৃন্দাবন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পরে মৌলভীবাজার মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল থেকে ট্রেনিং নেন। ২০১৪ সাল। তখন তিনি মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে কাজ করতেন। ঐ সময় থেকে তার রক্তদান কার্যক্রম শুরু। শুধু রক্তদান কিংবা রক্ত সংগ্রহ নয়। গর্ভবতী মায়ের স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করানোর কাজও তিনি করেন। এ পর্যন্ত ৪৩৯ জন নারীর স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ৬টা ছিল যমজ বেবী। এত অল্প বয়সে এতগুলো নারীর স্বভাবিক প্রসব আর কেউ করাতে পারেনি। পথ মসৃণ ছিল না। নানা রকম কথা মানুষ বলত। এসব সানজানা পাত্তা দেননি। এক লোক আমার ক্ষতি করেছিল। খারাপ ব্যবহার করেছিল। একদিন তার বউ অসুস্থ হলো। তখন দু ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দেই। এভাবেই খারাপ আচারণের মধুর প্রতিশোধ নেই। বললেন সানজানা। পরে লোকটি ভুল বুঝতে পারে। অনুতপ্ত হয়ে দু হাত তুলে দোয়া করল, আল্লাহ অবশ্যই আপনার ভালো করবেন দেখবেন দিদি। 

আন্তরিকভাবে তিনি রোগীদের সেবা করেন। আবার রোগী চলে গেলেন। পরে তার খোঁজ-খবরও নেন সানজানা। সেদিন গেলেন, স্টোক করা এক রোগীর কাছে। জানতে পারলেন গেল এক বছরে বড়ো মাছ দিয়ে তারা ভাত খাননি। নিরামিষ খান। কটকটে রোদের মধ্যে ছুটলেন তিনি সাইকেল নিয়ে। কিনে আনলেন মাছ, টমেটো, আলু, কাঁচা মরিচ, মিষ্টি, বিস্কুট। প্রায় ৯০০ টাকার বাজার। রান্না করে পাশে দাঁড়িয়ে খাওয়ালেন। পরম তৃপ্তি নিয়ে লোকটি তা খেল। সানজানা এমনই, ছুটে গিয়ে গরিব, দুস্থদের পাশে দাঁড়ান। তাদের সাহায্যের জন্য অন্যদের কাছে বলেন। এতেই তার তৃপ্তি। আরেক রোগীকে বললেন, কী খেতে ইচ্ছে করে? রোগী মিষ্টি খেতে চাইল। সানজানা তাকে মিষ্টি এনে খাওয়ালেন। রোগীদের পরম বন্ধু তিনি। সুখ দুঃখেরও অংশীদার। অথচ তার দুঃখের ভাগীদার কেউ নেই। পাহাড়ি পথ। চলাচলে একটি সাইকেল প্রয়োজন। দ্রুত রোগীর সেবা দিতে। কত টাকাই বা দাম সাইকেলের। একবারে কেনার সামর্থ্য তার নেই। দ্বারস্থ হলেন এক স্যারের। তিনি সাইকেল কিনে দিলেন। আস্তে আস্তে সানজানা তার মূল্য পরিশোধ করলেন। মহিলাদের সন্তান ডেলিভেরি নিয়ে কাজ করেন সানজানা। সেদিন এক মহিলা বললেন, ভাত খাব। খুব ক্ষুধা লাগছে। ডেলিভেরি তখনও তার হয়নি। হাসপাতালে ভাত দেয় সন্ধ্যা সাতটায়। এখন কোথায় ভাত পাবে সে? রুমে গেলেন। নিজের ভাত, তরকারি, মাংস নিয়ে এলেন। রোগী পরম তৃপ্তি নিয়ে খেল। সেদিন আর সানজানার ভাত খাওয়া হয়নি। এই ছোটো ছোটো কাজ-ই আমাকে শান্তি দেয়। নিজের হাজারো কষ্টের মাঝে এগুলোই শান্তি। বলছিলেন সানজানা শিরিন। চা শ্রমিকরা গরিব। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। সানজানা সময় পেলেই ছুটে যান। তাদের পাশে দাঁড়ান। চিকিত্সা, খাবার, কাপড় যা প্রয়োজন। মিটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন।