মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় ভাঙনের তীব্রতা আরো বেড়েছে। গত এক মাসের ভাঙনে এই দুই উপজেলার শত শত ঘর বাড়ি, ফসলের জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাট-বাজারসহ বহু স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে বহু সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, বিদ্যালয়, ঈদগা, মসজিদ-মাদ্রাসা, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, ঘর-বাড়ি, ফসলের জমিসহ আরো বহু স্থাপনা। প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে এই দুই উপজেলার কোনো না কোনো এলাকা। গত তিন-চার সপ্তাহের ভাঙনে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অনেক ঘর-বাড়ি ভেঙেছে। এখনো কয়েক হাজার পরিবার নদী ভাঙন আতঙ্কে দিশেহারা।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চলতি বর্ষায় মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। হুমকির মুখে রয়েছে দুই উপজেলার হাজার হাজার মানুষের সহায়-সম্পদ। বিশেষ করে কমলনগর উপজেলার পাটওয়ারীর হাট, চরফলকন, সাহেবের হাট, মাতব্বরহাট, লুধুয়া ও রামগতি উপজেলার গাবতলী, বাংলা বাজার, বড়খেরী ও আসলপাড়াসহ বহু এলাকা ভাঙনের হুমকির মুখে।
কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে হাফিজ মিয়া বাড়ির ভিটেমাটিতে বসে আছেন। তার বাড়ির উঠানেই জেলেরা ইলিশ ধরছেন। ঘরের কোণে নারিকেল গাছটি নদীতে হেলে পড়েছে। ভাঙনের মুখে আরো কয়েকটি সুপারি গাছ। বাপ-দাদার গড়া বাড়িটি বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটিও চলে যাচ্ছে নদীতে। এমন পরিস্থিতিতে নদীর প্রতিটি তীব্র ঢেউ যেন তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ছে।
এদিকে, ভাঙনকবলিত ফলকন ইউনিয়নের লুধুয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় লোকজনসহ আশপাশের বাসিন্দারা বাঁশ ও গাছের খুঁটি দিয়ে বেড়া তৈরি করেন। বেড়ার ভেতর দিয়েছেন ঝোপ-জঙ্গল। এ ছাড়া জিও ব্যাগে বালু ভরে নদীর পাড়ে বসাচ্ছেন। গত দুই সপ্তাহে এভাবে প্রায় ২৫০ মিটার বাঁধ তৈরি করেছেন তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, মাত্র এক কিলোমিটার বাঁধ কমলনগরের নদী ভাঙন প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আরো আট কিলোমিটার। অব্যাহত ভাঙনে ওইটুকু বাঁধে দেড় বছরে ধস নেমেছে অন্তত ১০ বার। তাই তারা এখন নদীতে জংলাবাঁধ দিচ্ছেন। জংলাবাঁধের কারণে নদীর ঢেউ পাড়ে সরাসরি আঘাত করতে পারবে না। এতে ভাঙন কিছুটা হলেও কমে। এভাবে বর্ষা মৌসুম পার করতে পারলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা করছেন তারা।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় ৩৫ কিলোমিটার নদী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রথমপর্যায়ে কমলনগরে এক কিলোমিটার ও রামগতিতে সাড়ে চার কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয়পর্যায়ে কমলনগররে আট কিলোমিটার ও রামগতিতে সাড়ে সাত কিলোমিটার এবং তৃতীয় পর্যায়ে ১৪ কিলোমিটার তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুমোদন না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ থেমে আছে।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা বলেন, মেঘনা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে দ্বিতীয় পর্যায়ের তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব) আবদুল মান্নান বলেন, সারাবছর ধরে মেঘনার ভয়াবহ ও অব্যাহত ভাঙনে কমলনগর ও রামগতির মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এ ভয়াবহ ভাঙন রোধে সরকারিভাবে বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
