ফুল বিছানো চাদরে শায়িত শেফালি জারিওয়ালার নিথর দেহ। লাল ওড়নায় ঢেকে, রাতের আঁধারেই শেষযাত্রায় রওনা হন স্বামী পরাগ ত্যাগী। শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে বিদায়বেলায় স্ত্রীর কপালে শেষ চুমু এঁকে দেন তিনি। শেষবারের মতো মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন শেফালির মা।
মাত্র ৪২ বছর বয়সে মারা গেছেন বলিউডের এই মডেল ও অভিনেত্রী। দর্শকের কাছে তিনি ‘কাঁটা লাগা গার্ল’ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। কেন এত অল্প বয়সেই মৃত্যু হলো অভিনেত্রীর এই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে সকলের মনে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। অবশেষে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হলো অভিনেত্রীর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ঠিক কী পাওয়া গেছে?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা যায়, শেফালি জারিওয়ালার মৃত্যু হয় আগের রাতে (শুক্রবার), রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। বাড়িতে তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। এরপর স্বামী পরাগ ত্যাগী ও কয়েকজন মিলে অভিনেত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শেফালীর মৃত্যুর পর পুলিশকে খবর দেওয়া হয় শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা নাগাদ। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ অভিনেত্রীর বাড়িতে পৌঁছায়। সেখানে তদন্তের পর তার মৃতদেহ মুম্বাইয়ের কুপার হাসপাতালে পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের জন্য। যাতে তার মৃত্যুর আসল কারণ জানা যায়।
কুপার হাসপাতালে শনিবার (২৮ জুন) বিকেল ৫টা নাগাদ সম্পন্ন হয় মরদেহের ময়নাতদন্ত। এরপর অভিনেত্রীর মরদেহ তার মুম্বাইয়ের বাড়িতে নেওয়া হয়। যেখানে পুরো পরিবার অভিনেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে আসে। অভিনেত্রী শেফালির শেষকৃত্যের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন স্বামী পরাগ।
শেফালি জারিওয়ালার মৃত্যুর পর থেকেই পুলিশ তদন্তে নেমেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিনেত্রীর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আপাতত সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এতে কোনো ষড়যন্ত্র বা সন্দেহজনক দিক পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রাথমিক তদন্তেও কোনো সন্দেহজনক বিষয় পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত এখনও চলছে। অভিনেত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তার স্বামী ছাড়াও বাড়ির কর্মচারীসহ ৮ জনের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে শেফালি জারিওয়ালাকে শেষ বিদায় জানাতে তার পরিবার ছাড়াও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন। স্ত্রী শেফালিকে শেষ বিদায় জানানোর পর পরাগ ত্যাগীকে কাঁদতে দেখা যায়। শেষকৃত্যের পর তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন এবং হাতজোড় করে শেফালির জন্য প্রার্থনা করতে বলেন। পরাগ বলেন, ‘আপনারা আমার পরীর জন্য প্রার্থনা করুন প্লিজ...।’
শেফালির আকস্মিক এই মৃত্যুতে বলিউডে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার মৃত্যুরহস্য ঘিরে চলছে নানা জল্পনা। এমনও শোনা যাচ্ছে, ‘অ্যান্টি এজিং’ চিকিৎসা চলছিল শেফালির, নিচ্ছিলেন ইঞ্জেকশনও! সেটাও হয়তো মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রভাব ফেলতে পারে।
শেফালি জারিওয়ালা ২০০২ সালে ‘কাঁটা লাগা’ মিউজিক ভিডিওর মাধ্যমে রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন। এই রিমিক্স গানটি তাকে ‘কাঁটা লাগা গার্ল’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। তার সাহসী চেহারা এবং নৃত্যশৈলী তৎকালীন পপ সংস্কৃতিতে একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা হয়ে ওঠে। এরপর তিনি ‘কাভি আর কাভি পার’ সহ আরও কয়েকটি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেন। ২০০৪ সালে তিনি সালমান খান এবং অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘মুঝসে সাদি কারোগি’ চলচ্চিত্রে একটি ছোট ভূমিকায় অভিনয় করেন।
এছাড়াও তিনি কন্নড় চলচ্চিত্র ‘হুদুগুরু’, ওয়েব সিরিজ ‘বেবি কাম না’ এবং ‘রাত্রি কে যাত্রী’ নামে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ করেছেন।
টেলিভিশন জগতে শেফালি ২০০৮ সালে ‘বুগি উগি’ রিয়েলিটি শো দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তার স্বামী পরাগ ত্যাগীর সাথে ‘নাচ বালিয়ে ৫’ এবং ‘নাচ বালিয়ে ৭’-এ অংশগ্রহণ করেন, যেখানে তাদের জুটি দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তবে, তার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় সালমান খানের হোস্ট করা ‘বিগ বস ১৩’-এর মাধ্যমে। শো-তে তার সততা, সাহস এবং প্রাক্তন প্রেমিক সিদ্ধার্থ শুক্লার সঙ্গে পুনর্মিলনের মুহূর্তগুলো দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শেফালি তখন বলেছিলেন, ‘আমরা সম্পর্ক ভাঙার পরেও সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিলাম।’
২০২৪ সালে তিনি ‘শৈতানি রসমে’ নামে একটি টিভি শো-তে অভিনয় করে তার টেলিভিশন ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেন।
এদিকে মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেফালির শেষ পোস্ট ছিল প্রয়াত অভিনেতা সিদ্ধার্থ শুক্লাকে ঘিরে। প্রথমে গায়ক হরমিত সিংহকে বিয়ে করেছিলেন অভিনেত্রী, যা ২০০৯ সালে ভেঙে যায়। পরে ২০১৪ সালে ‘পবিত্র রিশতা’ খ্যাত অভিনেতা পরাগ ত্যাগীকে বিয়ে করেন শেফালি। একই ধারাবাহিকের নায়ক ছিলেন প্রয়াত সুশান্ত সিং রাজপুতও।

