গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত সবাই হত্যা মামলার আসামি হচ্ছেন। দেশের কোথাও ছেলেধরার কোনো ঘটনার সত্যতা না পাওয়ার প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ এমন গুজবে ছেলেধরা সন্দেহে গত ৯ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে মারা গেছেন ছয় জন। আহত হয়েছেন ১৫ জন। গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। ৯টি মামলা এবং ১৫টি জিডি হয়েছে। হঠাত্ এই ধরনের গণপিটুনি ঘটনার পেছনে পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারীদের ষড়যন্ত্র কিংবা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে কোনো মহলের চক্রান্ত আছে কি না তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে যাতে কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ঐ বার্তায় এসপিদের ১১টি নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি গণপিটুনিতে হত্যা বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তিন দিনের মধ্যে জানাতেও বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতু নিয়ে নানা বিরোধিতা হয়েছিল। সরকার সব বাধা অতিক্রম করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে। এর নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে আসার সময়ে গুজব ছড়ানোর পেছনে কাদের সম্পৃক্ততা আছে, সেটি চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তত্পর।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ইত্তেফাককে জানান, গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনটা ব্যক্তিগত আক্রোশ, আবার কোনটাতে ভাড়া দিতে না পারায় ভাড়াটিয়াকে শাস্তি দেওয়াসহ নানা ঘটনার তথ্য বেরিয়ে আসছে। তবে কোথাও ছেলেধরার ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। হতাহতরা সকলেই নিরীহ ও অসহায় মানুষ। তাই গণপিটুনির ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সারাদেশের পাড়া-মহল্লায় জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে সঙ্গে নিয়ে গুজব সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। গণপিটুনিতে যারা মারা গেছে, সেক্ষেত্রে জড়িতরা হত্যা মামলার আসামি হবেন। আহত করার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা হবে। আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। কোনো ধরনের গুজবে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, সন্দেহ হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। তিনি বলেন, গুজব সৃষ্টির পেছনে কোনো মহলের চক্রান্ত আছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও গুজব সৃষ্টি করা হয়েছিল। এখন পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব সৃষ্টি করা হচ্ছে। দেশের মানুষ শান্তিতে আছেন। সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য এই ধরনের গুজব সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গুজব থেকে গণপিটুনিতে পাগল, প্রতিবন্ধী ও নিরীহ মানুষ মারা গেছেন। তিনি বলেন, এখন তথ্য প্রযুক্তির যুগ। সিসি ক্যামেরা ও স্মার্টফোন আছে। ঘটনার সময় জড়িতদের ছবি সিসি ক্যামেরা কিংবা স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজেই শনাক্ত করা যায়। গুজব সৃষ্টির পেছনে কোনো মহলের উস্কানি আছে কি না তা চিহ্নিত করার কাজ চলছে। গুজবে কান না দিতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য একটি মহল গুজব সৃষ্টি করছে। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করেছিল এক্ষেত্রে তাদের সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে সন্দেহ হলে ৯৯৯-এ ফোন করতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজধানীতে গুজব সৃষ্টিকারীরা কঠোর শাস্তি পাবেন।
ঢাকা রেঞ্জের প্রত্যেকটি জেলায় গুজব ও গণপিটুনি রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পুলিশ কাজ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জনসমাগমস্থলে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। কাউকে সন্দেহ হলে কেউ যাতে অতিউত্সাহী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়—সে বিষয়ে সবাইকে সর্তক করা হয়েছে। জানা গেছে, ছেলেধরার কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা চূড়ান্তভাবে একটা গুজব। সিদ্ধিরগঞ্জে একজন বাক্প্রতিবন্ধীকে ছেলেধরা সন্দেহে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাত্ক্ষণিকভাবে এ ঘটনায় জড়িত ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তাসলিমা বেগম রেনু (৪০)। তিনি উত্তর বাড্ডায় স্কুলে ছেলেমেয়ের ভর্তির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলেন।
‘ছেলেধরা’ গুজব রোধে এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের সতর্ক থাকার নির্দেশ
দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে হত্যা বন্ধে এবার দেশের সব মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের প্রতি মাউশির নির্দেশনায় বলা হয়, ‘ছেলেধরা বিষয়ক গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও নিরীহ লোকজনকে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা রোধে সতর্ক থাকতে হবে। নির্দেশনায় বলা হয়, ‘সতর্ক করা যাচ্ছে যে, কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, তার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।’
যেভাবে গুজবের সূত্রপাত
পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে জড়িত চীনের এক কর্মকর্তা আলোচনার সময় প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, ‘উই নিড মোর হেড’। এটি বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দ্রুত পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য তাদের আরো জনবল দরকার; কিন্তু গুজব রটনাকারীরা জনবলের পরিবর্তে ‘মানুষের মাথা লাগবে’ বলে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে। অবশ্য এই গুজব যারা প্রথম ছড়িয়েছে, তাদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ ও র্যাব এ পর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করেছে, তারা মূলত পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব-সংক্রান্ত বিভিন্ন পোস্ট শেয়ার করেছে। প্রসঙ্গত, এর আগেও দেশে গুজব ছড়িয়ে বেশ কয়েকটি বড়ো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৩ সালের মার্চে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ‘চাঁদে দেখা গেছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছিল। গুজব ছড়িয়ে রামুর বৌদ্ধমন্দির, নাসিরনগর ও রংপুরে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। ‘নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন’ চলার সময়ও বিভিন্ন গুজব ছড়ানো হয়। ২০১১ সালে আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া গুজব ছড়িয়ে হত্যার ঘটনা আরো অনেক আছে।
