এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর শোক না কাটতেই নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে তাঁর রেখে যাওয়া দল জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। আর এই দ্বন্দ্বের প্রধান দুই চরিত্র এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোটো ভাই জি এম কাদের। ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর চার দিনের মাথায় ১৮ জুলাই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জাপার ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন এর আগে দুই মাস ধরে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ থাকা কাদের। আবার পাঁচ দিনের মাথায় সোমবার রাতে হাতে লেখা এক বিবৃতিতে দেবর কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার কথা জানিয়ে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেই দায়িত্ব পালনের কথা বলেন ভাবি ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন। এর প্রতিক্রিয়ায় গতকাল মঙ্গলবার কাদের বললেন, ‘বিবৃতিটি হাতে লেখা ও কাঁচা। এটা বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্য নয়।’
এর আগে গত ৪ মে মধ্যরাতে সাংবাদিকদের বারিধারার বাসায় ডেকে এরশাদ লিখিতভাবে ঘোষণা দেন, ‘আমার অবর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আমার ছোটো ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের এমপি বর্তমান কো-চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি পালন করবেন।’ ‘সাংগঠনিক নির্দেশ’ শিরোনামের ঐ চিঠিতে এরশাদ তখন তাঁর অসুস্থতার কারণে জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেন। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা দলের প্রয়াত চেয়ারম্যানের দিয়ে যাওয়া সেই সিদ্ধান্তের আলোকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘জি এম কাদের সাহেব এখন থেকে দলের চেয়ারম্যান।’ সেইদিনই রওশন ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আমি বিষয়টা দেখেছি, চিন্তা করছি, চিন্তা করে আমি আমার কথা বলবো।’
জি এম কাদেরকে পাশে রেখেই রাঙ্গার দেওয়া এই ঘোষণায় নাখোশ হন রওশনসহ দলটির সিনিয়র নেতাদের অনেকে। বিষয়টি টের পেয়ে শনিবার রওশনের গুলশানের বাসায় যান কাদের। পরে জাপার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জি এম কাদেরকে আশীর্বাদ করে দিয়েছেন রওশন। ঐ বিজ্ঞপ্তিতে এ-ও বলা হয়, রওশনের পরামর্শে কাদের দলকে এগিয়ে নেবেন। ঐদিন জাপা চেয়ারম্যানের প্রেস অ্যান্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, রওশন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। রওশনের বাসায় কাদেরের সঙ্গে এই আলোচনা হয়েছে বলেও গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন সুনীল।
রওশনের বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে:কাদের যখন দাবি করলেন মাতৃতুল্য ভাবির ‘আশীর্বাদ’ পেয়েছেন, তখন সোমবার গভীর রাতে নিজের সংসদের প্যাডে বিবৃতিতে ভিন্ন বার্তা দিলেন সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা রওশন। রওশনসহ জাপার কেন্দ্রীয় ১০ নেতার নামে দেওয়া এই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সম্প্র্রতি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের মারফত জানতে পেরেছি, জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা আদৌ কোনো যথাযথ ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে ধারা ২০ (২) এর খ-এ দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। যথা—মনোনীত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রেসিডিয়ামের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারম্যানের অবর্তমানে এই ধারা উপেক্ষা করা যাবে না। আশা করি বর্তমানে যিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।’
দুই পৃষ্ঠার হাতে লেখা এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এটাও বলা হয়, পার্টির অনেক সিনিয়র নেতা রওশনের ঐ বক্তব্যের সঙ্গে একমত। তাদের মধ্যে সাতজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দুই জন এমপির নামও ঐ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত করা হয়। তারা হলেন—প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, মীর আব্দুস সবুর আসুদ, নাসরিন জাহান রত্না এমপি, অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী এমপি, অধ্যাপিকা রওশন আরা মান্নান এমপি ও সেলিম ওসমান এমপি, দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি।
হাতে লেখা এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটির বিষয়ে জাপার কেউ কেউ প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে রওশনের পক্ষ থেকে এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। জানা গেছে, গভীর রাত হওয়ায় কম্পিউটারে কম্পোজ করতে না পারার কারণে হাতে লেখা বিজ্ঞপ্তিই গণমাধ্যমকে সরবরাহ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে রওশনসহ ১০ জনের নাম থাকলেও শুধুমাত্র রওশনের নামের সামনে তার স্বাক্ষর রয়েছে, অন্যদের স্বাক্ষর নেই। এ ব্যাপারে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তিটি সঠিক। আমরা সম্মিলিতভাবে এটা দিয়েছি।’ মীর আব্দুস সবুর আসুদ ও লিয়াকত হোসেন খোকাও রওশনের বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে তাদের সমর্থন থাকার বিষয়টি ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেন।
কাদের যা বললেন: এদিকে রওশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে গতকাল জাপার বনানী কার্যালয়ে জি এম কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাপায় কোনো বিভেদ নেই। জাপা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। নেতৃত্বের প্রশ্নে জাপায় কোনো দ্বন্দ্ব নেই। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের পরিবারে পিতৃতুল্য ছিলেন। সেইভাবেই বেগম রওশন এরশাদ আমাদের মায়ের মতো। এরশাদের নির্দেশনায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছি। এখনো তাঁর নির্দেশনাতেই চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছি। জাপা নেতৃবৃন্দ গঠনতন্ত্র অনুসরণ করেই আমাকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। তারা যে নামেই সম্বোধন করবেন তাতে কোনো সমস্যা নেই। পার্টিতে কাজ করাটাই আসল কথা। কোনো সমস্যা থাকলে আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করবো।’
জি এম কাদেরের এই প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে ফখরুল ইমাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘উনি (কাদের) ওনার কথা বলেছেন, আমরা আমাদের কথা বলেছি। সবাই শোকের মধ্যে আছি, সেজন্য এখন আর কঠিন ভাষায় কিছু বলতে চাই না, সময় হলে আমরা বাকি কথা বলবো।’
