দেশজুড়ে জনপ্রিয় ‘মিনিকেট চাল’ নামে বাজারজাত চালের পেছনে নেই কোনো স্বীকৃত ধানের জাত। কুষ্টিয়াসহ দেশের কোথাও ‘মিনিকেট’ নামের ধানের চাষ হয় না—তবুও কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম মিনিকেট চালের বড় উৎস হিসেবে পরিচিত। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আসলে বিভিন্ন জাতের ধান থেকে উৎপাদিত চালকেই পলিশ করে চকচকে ও সাদা করে মিনিকেট নামে বাজারজাত করছেন মিল মালিকরা। এতে করে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামের অন্তত ৭০টি অটো রাইস মিল ও ৩০০টিরও বেশি হাসকিং মিল প্রতিদিন উৎপাদন করছে মিনিকেট গোল্ড/গোল্ডেন, মিনিকেট সুপার ও সাধারণ মিনিকেট চাল। অথচ কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এমন কোনো ধানের জাত দেশে নেই। মিল মালিকরা মূলত জিরাশাইলসহ অন্যান্য জাতের ধান থেকে চাল উৎপাদন করে তা পলিশ করে মিনিকেট নামে বাজারজাত করছেন।
চকচকে রূপের আড়ালে পুষ্টিহীনতা
চালের উপরিভাগের আঁশ মেশিনে ছাঁটাই করে সাদা ও চকচকে রূপ দেওয়া হলেও এতে চালের গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। এই আঁশে থাকা ভিটামিন বি২ ও অন্যান্য উপকারী উপাদান হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিমণ চাল থেকে প্রায় এক কেজি আঁশ ফেলে দিয়ে করা হচ্ছে অতিপলিশ, যা চালকে পরিণত করছে শুধুই কার্বোহাইড্রেটে। ফলে পুষ্টিহীন এই চাল স্বাস্থ্যহানিকর বলেই মত পুষ্টিবিদদের।
অতিরিক্ত ছাঁটাই ও প্রসেসিংয়ের কারণে প্রতিবছর খাজানগর মোকামে গড়ে ১৮ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি চাল অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এটিকে জাতীয় পর্যায়ের অপচয় বলেও উল্লেখ করেছেন। এদিকে বিভিন্ন জাতের চাল যথাযথভাবে গ্রেডিং না করায় বাজারে গুণগত মানহীন চাল ছড়িয়ে পড়ছে।
কৃষি বিভাগের কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক মো. রফিকুজ্জামান জানান, বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় প্রায় ৪০ ধরনের ধানের চাষ হয়, যেমন ব্রি-৭৫, ব্রি-৮৭, ব্রি-৫০, ব্রি-৬৩, ব্রি-১০২, বিনাধান-২৫ ও বিভিন্ন হাইব্রিড জাত। এসব ধানে উৎপাদিত চাল বাজারে অনুপস্থিত। তাহলে সেই চাল যাচ্ছে কোথায়—সে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সুজাত হোসেন খান জানান, মিনিকেট নামে কোনো ধানের জাত নেই—এটি সত্য। তবে এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় মিল মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
মোকামের মিল মালিকদের দাবি, যশোর ও উত্তরাঞ্চলে কৃষকরা মিনিকেট নামেই ধান বিক্রি করছেন। কিন্তু এই ধান আসলে কোন জাতের—সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। খাজানগর অটো রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদীন প্রধান বলেন, ‘মোকামে কোনো কারসাজি নেই, মোটা চাল কাটিং করে সরুতে রূপান্তরের অভিযোগও সঠিক নয়।’
তাহলে আমরা কী খাচ্ছি?
যখন দেশে মিনিকেট নামে কোনো ধান নেই, তখন বাজারে ছড়ানো মিনিকেট চাল আসলে কী? প্রতিদিনের প্রধান খাদ্য চাল যখন পুষ্টিহীন ও মানহীন হয়ে ওঠে, তখন শুধু স্বাদ নয়, প্রশ্ন ওঠে স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিয়েও। ভোক্তাদের প্রশ্ন—‘মিনিকেট নামে আমরা আসলে কী খাচ্ছি?’ সরকারের দায়িত্বহীনতা এবং নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার ফলে খাদ্যে প্রতারণা যেন এখন স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
