চির বিরহী পাখি ডাহুক। বাংলার বিল-ঝিলের এই পাখি সঙ্গীহীন অবস্থায় এক রতি সময়ও কাটাতে চায় না। চর্যাপদ থেকে শুরু করে হালের কবিতা, গান, গল্প, নাটক, লোকসাহিত্য—সবখানেই রয়েছে ডাহুকের উপস্থিতি। দূর থেকে ভেসে আসা ‘কোয়াক কোয়াক’ ডাকে বুঝা যায়, ডাহুকজোড় মনের আনন্দে মাতোয়ারা। অথচ প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশের বন্ধু এই পাখিটি আজ নানা কারণে হুমকির মুখে।
ডাহুকের বৈজ্ঞানিক নাম Amaurornis phoenicurus। বাংলায় এদের অনেকেই ‘ডাইক’ বা ‘পান পায়রা’ নামেও চেনে। এটি ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত। পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল, বিল, ঝিল, পুকুর, নালা, নদীর বাঁক—সব ধরনের আগাছায় পূর্ণ জলাভূমিতে ডাহুক স্বাচ্ছন্দে বিচরণ করে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) ২০১২ সালে ডাহুককে ‘নূন্যতম বিপদগ্রস্ত’ (Least Concern) প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
মাঝারি আকারের এই পাখিটির দেহ কালচে। মুখমণ্ডল, গলা, বুক এবং পেট সাদা। ঠোঁটের গোড়ায় হলুদের মাঝে লাল রঙের দীপ্তি দেখা যায়। ডাহুক খুবই চতুর ও সতর্ক স্বভাবের। মানুষ দেখলেই গা ঢাকা দেয়। এরা দ্রুতগতিতে দৌড়াতে পারে এবং দ্রুত খাবার সংগ্রহে সক্ষম। খাদ্যতালিকায় থাকে জলজ পোকামাকড়, উদ্ভিদের কচি অংশ ও শ্যাওলা।
কৃষিবিদ ড. নজরুল ইসলাম জানান, ডাহুক শুধু জলজ প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এরা বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে। তাই ডাহুক কৃষি ও কৃষকের প্রকৃত বন্ধু। তবে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে অন্যান্য জলজ প্রাণীর মতো ডাহুকও আজ চরম ঝুঁকিতে।
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ডাহুকের প্রজননকাল। এর আগে স্বামী-স্ত্রী মিলে বাসা তৈরি করে। উভয়েই ডিমে তা দেয় এবং পরে বাচ্চাদের নিয়ে খাবার সংগ্রহে বের হয়।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাখিপ্রেমী ও সৌখিন ফটোগ্রাফার কামাল হোসেন বলেন, ডাহুক জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণ-প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। খুব উপকারী পাখি এটি। কিছুদিন আগে ঘাটাইলের একটি ডোবা থেকে মায়ের সঙ্গে ছুটে চলা একটি শিশু ডাহুকের ছবি তুলেছি। দেশের বিল-ঝিল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় ডাহুকরা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। এখন তারা ছোটখাটো ডোবা ও ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নিচ্ছে। এই পাখির টিকে থাকার জন্য আমাদের মমত্ববোধ বাড়াতে হবে, না হলে ভবিষ্যতে একে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ডাহুক অনেক সময় পোষ মানে। সেই পোষা ডাহুক দিয়েই শিকার করা হয় মুক্ত ডাহুক। এমনই এক শিকারি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল গ্রামের ৯০ বছর বয়সী আব্দুল গফুর। তিনি জানান, টানা ৪০ বছর ধরে পোষা ডাহুক দিয়ে শিকার করি। একসময় প্রতিদিন আশপাশের বিল থেকে ২০-২৫টি ডাহুক ধরা যেত। এখন অধিকাংশ বিল ভরাট হয়ে গেছে। যান্ত্রিক সেচ, ইউরিয়া সার ও রাসায়নিক খাবারে পানি দূষিত হয়ে গেছে। ফলে ডাহুক আর সেখানে বাস করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, এখন আশপাশের বিলে ডাহুক নেই বললেই চলে। দূরের জলাশয়ে গিয়ে সপ্তাহে চার-পাঁচটির বেশি ধরা যায় না। ডাহুক খুব রাগী পাখি। খাঁচায় বন্দি পোষা ডাহুক যখন ডাকে, তখন মুক্ত ডাহুক বিরক্ত হয়ে কাছে আসে। ডাকাডাকির পর তারা খাঁচায় ধরা পড়ে। এমনকি স্ত্রী ডাহুক অনেক সময় নিজের সঙ্গীকে ছাড়িয়ে নিতে এসে নিজেও বন্দি হয়।

