সামাজিক যোগাযোগের সাইট হিসেবে কিছুদিন আগেই ফেসবুক পেরিয়ে গেছে কয়েকশ কোটি ব্যবহারকারীর ল্যান্ডমার্ক। এ ছাড়া টুইটার, লিংকএডইনসহ সামাজিক যোগাযোগের অন্যান্য সাইটগুলোও বিশ্বব্যাপী সমান জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার পরিমাণও দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করতেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধীরা। সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে নানান ধরনের ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার ছড়িয়ে দিতে তারা সর্বদাই সচেষ্ট। পাশাপাশি আপনার বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাক করে নিয়েও তারা ছড়িয়ে দিতে পারে অন্যদের কাছে। নিজের নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা রক্ষায় তাই সচেষ্ট হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করতে সাইটগুলোতে রয়েছে নিজস্ব সব সেটিং। তবে এসব সেটিংস আপনাকে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়। আর সেই পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা দিতে রয়েছে নানা ধরনের সফটওয়্যার, অ্যান্টিভাইরাস, অ্যান্টিম্যালওয়্যার, অ্যান্টিস্পাইওয়্যার এবং নানা ধরনের অ্যাড-অনস। সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর জন্য যেসব সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সিকিউরিটি অ্যাপস রয়েছে, সেগুলো মূলত দুই ধরনের হতে পারে। এর প্রথমটিতে সাইটে পোস্ট করা নানা ধরনের মন্তব্যে, ছবিতে বা অন্যান্য কনটেন্টে অনেক সময়েই বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ফিশিং স্ক্যাম এবং ম্যালওয়্যার থাকতে পারে। এসব ক্ষতিকর লিংক থেকে নিজে সুরক্ষিত থেকে অন্যদের সুরক্ষিত রাখার কাজটি করতে পারে এক ধরনের সিকিউরিটি অ্যাপস। আর দ্বিতীয় ধরনের অ্যাপসগুলোর মূল কাজ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে শিশুদের রক্ষা করা। অনেক সময়েই শিশুরা এমন ধরনের ওয়েবপেইজের মুখোমুখি হতে পারে, যেগুলো কেবলই প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী। যৌনতা, মাদকদ্রব্য, সহিংসতা প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট যেসব ওয়েবপেইজ রয়েছে, সেগুলো থেকে শিশুদের দূরে রাখতে কাজ করবে দ্বিতীয় ধরনের সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সিকিউরিটি অ্যাপস। আজকের এই লেখায় উভয় ধরনেরই কয়েকটি সিকিউরিটি অ্যাপস নিয়ে আলোচনা করা হলো।
বিটডিফেন্ডার সেফগো
ফেসবুক এবং টুইটারের জন্য বিনামূল্যের একটি অ্যান্টিস্ক্যাম সেবা বিটডিফেন্ডার গো। যেকোনো ফেসবুক ব্যবহারকারীর ওয়ালে বা টাইমলাইনে পোস্ট করা সব ধরনের স্ট্যাটাস, ম্যাসেজ বা লিংক স্ক্যান করতে সক্ষম এই অ্যাড-অনসটি। শুধু বিটডিফেন্ডার সেফগো ব্যবহারকারীই নয়, এটি এর ব্যবহারকারীর বন্ধুদের স্ট্যাটাস আপডেট এবং কমেন্টসও স্ক্যান করে থাকে স্প্যাম, স্ক্যাম, ফিশিং, ম্যালওয়্যার এবং অন্যান্য ক্ষতিকর কার্যক্রম সনাক্ত করার জন্য। এর প্রাইভেসি ফিচারগুলো ফেসবুকে আপনি কী শেয়ার করছেন, কোনগুলো পাবলিকলি শেয়ার করছেন—এর সবই জানিয়ে দিতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি কোনগুলো কীভাবে শেয়ার করলে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, তাও জানিয়ে দেবে এই অ্যাপ্লিকেশন।
বিনামূল্যের এই অ্যাড-অনসটির ব্যবহারও বেশ সহজ। এটি নিজের ফেসবুক বা টুইটার অ্যাকাউন্টের সাথে সংযুক্ত করে নিলেই এটি ওই ফেসবুক বা টুইটারের অ্যাকাউন্টের যাবতীয় কার্যক্রম মনিটরিং শুরু করে। যখনই এটি আপনার ফেসবুক বা টুইটারের অ্যাকাউন্টে কোনো ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি সনাক্ত করে, তখনই এটি ওই সন্দেহজনক কার্যক্রমে মন্তব্য করে অথবা নোটিফিকেশন ফিডে ওই কার্যক্রমের তথ্য জানিয়ে দেয়। এ ছাড়া এটি যাতে প্রতি সপ্তাহেই আপনাকে আপনার অ্যাকাউন্টের যাবতীয় কার্যক্রমের একটি রিপোর্ট প্রদান করে, সেটিও সেটিংস থেকে নির্ধারণ করে দিতে পারবেন।
মাইপেজকিপার
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড এবং ‘স্টপ দ্য হ্যাকার’-এর যৌথ গবেষণার ফসল মাইপেজকিপার। এটি মূলত ফেসবুকের জন্য তৈরি একটি অ্যান্টিস্ক্যাম অ্যাপ্লিকেশন। বর্তমানে এই অ্যাপ্লিকেশনটি রয়েছে বেটা সংস্করণে। মাইপেজকিপার নামের এই অ্যাপ্লিকেশনটি আপনার ফেসবুকের যাবতীয় কার্যক্রমকে মনিটর করতে সক্ষম। আপনার প্রোফাইল এবং নিউজ ফিডের সব ধরনের পোস্ট মনিটর করে এটি আপনাকে জানিয়ে দিতে সক্ষম কোনো পোস্টে আপনার জন্য সন্দেহজনক কোনো গতিবিধি রয়েছে কি না। বিটডিফেন্ডার সেফগো’র মতো এই অ্যাপ্লিকেশনটিও আপনার প্রোফাইলে বা ফিডে কোনো ধরনের সন্দেহজনক কার্যক্রম সনাক্ত করলে সাথে সাথেই মন্তব্যের মাধ্যমে বা ইমেইল নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আপনাকে জানিয়ে দিবে। এর সেটিংস অপশনে গিয়ে ফেসবুকের সেটিংস পরিবর্তন করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্তব্য করার অপশনটি চালু রাখতে বা বন্ধ করে দিতে পারবেন।
সোশ্যাল শিল্ড
বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিভাইরাস হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম অ্যাভিরা। সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইটের জন্য এই অ্যাভিরা নিয়ে এসেছে মনিটরিং অ্যাপ্লিকেশন সোস্যাল শিল্ড। সোস্যাল নেটওয়ার্কিং মনিটরিং এই অ্যাপ্লিকেশনটি ফেসবুক, টুইটার থেকে শুরু করে মাইস্পেস, গুগল প্লাস, ফরমস্প্রিংসহ প্রায় সব সোস্যাল নেটওয়ার্কই সমর্থন করে থাকে। এর মাধ্যমে যে কারও সোস্যাল নেটওয়ার্কের অ্যাকাউন্টের সব ধরনের কার্যক্রম মনিটর করা যায়। এসব অ্যাকাউন্টের পাবলিক এবং প্রাইভেট পোস্ট, ম্যাসেজ, ফটো, ফ্রেন্ডস এবং অন্যান্য কনটেন্টগুলো মনিটর করা, বিশ্লেষণ করা এবং তাতে কোনো ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ করলে তা জানিয়ে দিতে সক্ষম এই সোস্যাল শিল্ড। অশ্লীলতা, যৌনতা, ধুমপান, মাদক গ্রহণ, মদ্যপানসহ সব ধরনের অসামাজিক কার্যক্রম মনিটর করতে পারে এই অ্যাপ্লিকেশন। সোশ্যাল শিল্ড অ্যাপ্লিকেশনে নিজের অ্যাকাউন্ট তৈরি করার পর এতে আপনি আপনার সন্তানদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সব তথ্য দিয়ে সেগুলো এতে যুক্ত করে নিতে পারবেন। অথবা আপনার সন্তানদের আমন্ত্রণও জানানো যাবে এই সার্ভিসের মাধ্যমে। তাদের আপনার এই অ্যাকাউন্টে যুক্ত করা হয়ে গেলে এটি আপনাকে নিয়মিত নোটিফিকেশন জানাবে।
মাইনর মনিটর
ফেসবুক এবং টুইটারের অ্যাকাউন্ট মনিটরিংয়ে আরেকটি অ্যাপ্লিকেশন মাইনর মনিটর। সোস্যাল শিল্ডের মতো এটিও আপনার সন্তানদের ফেসবুক ও টুইটারের অ্যাকাউন্টের যাবতীয় কার্যক্রম মনিটর করতে সক্ষম। তবে সোস্যাল শিল্ড কেবল আপনাকে সন্তানদের অ্যাকাউন্টের সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দিলেও মাইনর মনিটরের মাধ্যমে সন্দেহজনক অথবা সাধারণ—সব কার্যক্রমই লক্ষ করতে পারবেন। এখানেও আপনি একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করবেন। এরপর এতে আপনার সন্তানদের অ্যাকাউন্টের তথ্য যুক্ত করবেন। করা হয়ে গেলেই এটি যুক্ত করা অ্যাকাউন্টগুলোর বিশ্লেষণ করবে এবং আপনাকে কিছু সময়ের মধ্যেই প্রাথমিক একটি রিপোর্ট জানিয়ে দেবে। এটি ইতিবাচক এবং নেতিবাচক কার্যক্রমগুলোর তুলনামূলক একটি চিত্রও তুলে ধরবে আপনার সামনে।
