গুজবের রাজনীতি

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ২১:০১

মধ্যযুগের শেষে এবং আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে খোদ ইউরোপে আমরা ডাইনি হত্যার কথা শুনেছি। ইভা নামের একজন মহিলাকে ডাকিনিবিদ্যা প্রয়োগে একটি শিশু হত্যার অভিযোগে হত্যা করা হয়। চরম নির্যাতনের মুখে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং পৈশাচিক উল্লাসে তাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। সময়টা ছিল ১৫৭২ সাল এবং স্থানটি ছিল জার্মানি। সেই যে শুরু হলো, তারপর আর থেমে থাকেনি। ১৫৯০-এর মধ্যেই সেই জার্মান ভূখণ্ডেই ২ হাজার ২০০ মানুষের মধ্যে ৫০০ জনকেই পুড়িয়ে মারা হয় ডাইনি আখ্যা দিয়ে। ১৪০০ থেকে ১৭৮২ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মানুষ পুড়িয়ে মারা হয় ডাইনি আখ্যা দিয়ে। এছাড়াও নির্যাতন, গ্রেপ্তার, ঘৃণা, ভর্ত্সনার শিকার হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ—ডাইনি অভিযোগে। ইউরোপের বাইরে অফ্রিকা, এশিয়া এমনকি সমকালীন সাব-সাহারান আফ্রিকা, পাপুয়া নিউগিনি, ইন্ডিয়াতেও ডাইনি শিকারের (witch-hunt) ঘটনা ঘটে। সৌদি আরব ও ক্যামেরুনে ডাকিনিবিদ্যা প্রতিরোধে সরকারি আইন লক্ষ করা যায়। অধুনা ভারতেও মধ্যযুগের ডাইনি শিকারের আধুনিক সংস্করণ লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীল ঘোরতর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে মেতে উঠতে দেখা যাচ্ছে নারী নির্যাতন এবং হত্যায়। ডাইনির গুজরাটি পরিভাষা হলো দাকান। ভারতীয় ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ দাকান অভিযোগে নিগৃহীত এবং নিহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক কালে সামাজিক উন্নয়নের প্রায় সকল সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন মূল্যায়নের জায়গাগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ভারতীয় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার সব মহিমা যেন ফিকে হয়ে আসে, যখন চার বছরের নিষ্পাপ শিশু তুবার মা রেনুকে প্রকাশ্য দিবালোকে বীভত্স পৈশাচিকতায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। উন্মাদ উচ্ছৃঙ্খল জনতা বর্বর হয়ে ওঠে এক নিরীহ নারীর ওপর। কিল, ঘুষি, লাথি, লাঠির আঘাতে থেঁতলে দেয় তার দেহ। বর্বরতা চলে যতক্ষণ না নিথর নিস্তব্ধ হয় রেনুর শরীর।

মধ্যযুগে ডাইনিদের এভাবে শিকার করা হতো। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ডাইনি অভিযোগের সমর্থনে স্বীকারোক্তি আদায় করা হতো। ডাইনি অভিযোগটিই যেখানে কাল্পনিক ও হাস্যকর, সেখানে স্বীকারোক্তির সত্যতার ব্যাপারটি যে কত অবান্তর তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু উন্মত্ত উচ্ছৃঙ্খল জনতার উন্মাদনা চরিতার্থকরণের একটা মানসিক সাপোর্ট তো দরকার। Give a dog a bad name and hang him. চমত্কার!

ছেলেধরা তকমা লাগিয়ে দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো রেনুকে। রেনু ছেলেধরা হলেও তো এভাবে বিনা বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পেয়ে নিমর্মভাবে নিহত হওয়ার নিয়তিপ্রাপ্ত হতে পারে না।

ছেলেধরা কাকে বলে? এটি যদি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তাহলে তার বিচারের ব্যবস্থা কি বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে নেই? নাকি বাড্ডার সেই স্কুলের সামনে সমবেত উন্মাদ জনতা একযোগে ‘ছেলেধরা’ রেনুকে সংশ্লিষ্ট পুলিশের হাতে সোপর্দ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। রেনুর হত্যাকারীরা সাধারণ হত্যাকারী নয়। এরা মনোদৈহিক বিকারগ্রস্ত স্যাডিস্ট। মধ্যযুগে যারা ডাইনি অভিযোগ দিয়ে অবিবাহিত ও বিধবা নারীদের খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতন করত, রেনুর হত্যাকারীরা তাদের উত্তরসূরি। এটি গ্যাং রেপের এক ভিন্ন মাত্রিকতা। সেই অর্থে এরা রেপিস্টও বটে। সামাজিক কূপমণ্ডূকতার যে নৃশংসধারা উইচ-হান্ট কাল্টের জন্ম দিয়েছিল, সেই ধারাই আবার পুনর্জন্ম লাভের চেষ্টা করছে। শক্ত হাতে দমিত না হলে উইচ-হান্ট বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক অগ্রযাত্রার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।

সাম্প্রতিক সময়ের প্রধান গুজব হলো ‘পদ্মা সেতুর জন্য রক্ত ও মাথা প্রয়োজন’—ফেসবুকে এই গুজব ছড়িয়ে পড়লে তার উপজাত গুজব হিসেবে মাথা ও রক্ত সংগ্রহে বেরিয়ে পড়া ছেলেধরার গুজবটি ছড়িয়ে পড়ে। এবং সেই কথিত ছেলেধরা প্রতিহত করার নামে অত্যুত্সাহী ব্যক্তি/গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা। এর মাত্রা এতটাই প্রবল হচ্ছে যে, এক দিনেই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপ্রহারে দুই নারীসহ পাঁচজন প্রাণ হারায়। অনেকে নির্যাতনের শিকার হয়। ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধীও এই নির্মমতার হাত থেকে রেহাই পায়নি। মাসব্যাপী চলমান এই গুজবও সহিংসতার কারণে শতসহস্র উন্নয়নের পরও সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। সেই অস্থিরতাকে পুঁজি করে চলছে অপরাজনীতির পাঁয়তারা। পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ ‘রক্ত-মাথা’ গুজবের ভিত্তিহীনতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গণপ্রহারে হত্যাকাণ্ডকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে তুলে ধরে আইন হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সার্বিক অবস্থা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

কেন এই ধরনের গুজব রটানো হচ্ছে? এবং সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে? কারাই-বা এর রচয়িতা-অনুঘটক? সাধারণভাবে সুবিধাভোগী তত্ত্ব প্রয়োগ করে একটা সরল সমীকরণ টানা যেতে পারে। পদ্মা সেতুতে মাথা ও রক্তের উত্সর্গ ঠেকানোর জন্য এক বৃহত্ জাতীয় স্বার্থে যে রটনাকারীরা মাঠে নামেনি, তা বাজি ধরেই বলা যায়। বরং এর উলটোটাই সত্য। গুজব রটনাকারীরা পরিকল্পিতভাবেই গুজব ছড়াচ্ছে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করার জন্য। গুজব সৃষ্টিকারী, গুজব বাস্তবায়নকারী এবং গুজব বাস্তবায়নের লক্ষ্যবস্তু হয়তো-বা প্ল্যান করে নির্ধারণ করা হচ্ছে। সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষকে গুজবে প্রভাবিত করে বড়ো কোনো উদ্দেশ্যে একটি বৃহত্তর সামাজিক মাইন্ডসেট তৈরি করার চেষ্টাও হতে পারে। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারকার্য প্রভাবিত করার দুরভিসন্ধি নিয়ে চাঁদে সাঈদীর ছবি দেখা যাওয়ার গুজব রটনা করা হয়েছিল শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষকে যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর প্রতি সহমর্মী করে তোলার অপচেষ্টার মাধ্যমে। তাছাড়া গুজবের রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গুজব ছড়ানো হয়েছিল ইসলাম ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তান ভেঙে পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দুবাদী ভারত বানানো হচ্ছে। পঁচাত্তরের আগস্ট ট্র্যাজেডির পর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দেশে সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ ভারত হয়ে যাবে। মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি হবে। সাধারণ মানুষের অনেকে সেসব কমবেশি বিশ্বাসও করেছিল।

কিন্তু সত্যের অনিবার্য আত্মপ্রকাশের কারণে গুজবের দিন শেষ হতে বাধ্য। আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘তুমি কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারো কিংবা সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারো। কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারো না।’ রটনাকারীরা বাংলাদেশের সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারেনি। দেশের আত্মনির্ভরতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক পদ্মা সেতুর আসন্ন শুভ উদ্বোধনের সম্ভাবনায় যাদের গাত্রদাহ হচ্ছে, তাদের রটানো গুজবে এই বহুমাত্রিক স্থাপত্যকর্মের একটি পাথরকণাও বিচ্যুত হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই ঘৃণ্য গুজবের রাজনীতির কারণে তাসলিমা বেগম রেনুর কেজি-পড়ুয়া ছেলে এবং চার বছরের ফুটফুটে মেয়ে মায়ের সান্নিধ্য থেকে চিরবঞ্চিত হলো। এই ক্ষতি অপূরণীয়। এই লজ্জা  সীমাহীন। এই অপরাধ ক্ষমাহীন। শুনেছি, এই মর্মান্তিক বিয়োগান্তক ঘটনার খলনায়ক হূদয় নামের এক হূদয়হীন যুবক ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে। জড়িত বাকিদের অনতিবিলম্বে ধরা হোক। বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দান করা হোক—যাতে গুজব রটিয়ে গণপ্রহারের আরেকটি ঘটনাও না ঘটে এদেশে।

আরেকটি বিষয় অবশ্য লক্ষণীয়। মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার উত্সাহ এবং সাহস কোথা থেকে পাচ্ছে তার আর্থসামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজে বের করতে হবে। রাষ্ট্রতন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভেই—আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগ—সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মানবসমাজের সবচেয়ে সক্রিয় অংশ হলো যুবসম্প্রদায়। যুবসমাজকে জীবনবাদী, সংযত, মানবিক এবং দেশপ্রেমিক করে গড়ে তুলতে হবে। এবং তার জন্য প্রয়োজন আর্থসামাজিক স্থিতি। নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। সমাজ-গবেষকরা সামাজিক অস্থিতার যেসব  কারণ শনাক্ত করেছেন সেগুলো স্থায়ীভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। সার্বিক উন্নয়নের স্বাদ পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হলে শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে। জিডিপি (Gross Domestic Product) বাড়ানোর পাশাপাশি জিএনএইচ (Gross National Happiness)ও বাড়াতে হবে। 

n লেখক : কলামিস্ট, রাজনীতি বিশ্লেষক