বিরল প্রেমের পাখি ধনেশ

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৫, ০৪:৫৯

পৃথিবীর সব পাখির প্রেম-বিরহ যেন আটকে আছে রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার পরতে পরতে। সেই যে ‘পাখিরা’ কবিতায় জীবনানন্দ লিখে গেছেন, ‘তারপর চ’লে যায় কোন এক খেতে;/ তাহার প্রিয়ের সাথে আকাশের পথে যেতে-যেতে/ সে কি কথা কয়?/ তাদের প্রথম ডিম জন্মিবার এসেছে সময়...। এ যেন প্রকৃতির বিরল প্রেমের প্রতীক ধনেশ পাখিরই প্রণয়কাব্য।

প্রজনন মৌসুমে ডিম পাড়তে স্ত্রী ধনেশ গাছের ফোকরে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। আর পুরুষ ধনেশ কাদা ও ফলের মাংসল অংশ দিয়ে প্রায় বন্ধ করে দেয় কোটরের মুখ। এরপর ছয়-আট সপ্তাহ ধরে বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করে স্ত্রী-বাচ্চাদের বাঁচিয়ে রাখে অতন্ত্র প্রহরীর মতো। বাচ্চা উড়তে শেখা পর্যন্ত রক্ষা করে খাদক প্রজাতি থেকে। সঙ্গীও বদলায় না পুরুষ পাখি। ধনেশের এই ভালোবাসা ‘মানবপ্রেমের চেয়েও গভীর’। শুধু কি তাই? পাখিজগতে স্ত্রী ধনেশের মাতৃত্ব, আত্মত্যাগও বিরল।

অমর প্রেমের পাখি সেই ধনেশ অনেক অঞ্চলে ‘ধনপাখি’, ‘ডুমুরখেকো’ বা ‘বড় ঠোঁটওয়ালা পাখি’ নামেও পরিচিত। আগে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও সুন্দরবনের কিছু এলাকায় অনেক বেশি দেখা যেত। তবে কালের বদলে পরিবেশগত বিপর্যয়, বন উজাড় আর নির্বিচার শিকারের কারণে এখন প্রায় বিলুপ্ত। শুধু সীমিত সংখ্যায় টিকে আছে বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির গহিন অরণ্যে। 

ইতিহাস :ধনেশ পাখির আদিপুরুষের উদ্ভব ঘটেছিল প্রায় ৩-৪ কোটি বছর আগে। প্রাপ্ত জীবাশ্ম গবেষণায় জানা যায়, পাখিটির বিবর্তন শুরু হয় আফ্রিকা ও এশিয়ায়। প্রথম দিকে ছোট ও সরল ঠোঁট থাকলেও পরে ঠোঁট বড় ও ক্যাস্ক (ফাঁপা অংশ) বিবর্তিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, সঙ্গী আকর্ষণে ঠোঁট বড় হয়েছে। তাছাড়া বড় ঠোঁটের কারণে গাছের ভেতরে থাকা ফল সহজে সংগ্রহ করতে পারে। বিবর্তিত ফাঁপা অংশের কারণে ধনেশ পাখিরা উচ্চশব্দ সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রতিপক্ষকে ভয় পাইয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণিকুলে ধনেশ পাখির বিবর্তন বিস্ময়কর।

প্রাকৃতিক নির্বাচনে খাদ্য ও আবাসভিত্তিক অভিযোজন, প্রজনন পদ্ধতির উন্নয়নে ধনেশ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেই সঙ্গে প্রজননকালে ডিম ও ছানাদের সুরক্ষায় স্ত্রীকে গাছের ফোকরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তা প্রায় বন্ধের মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়ার ঘটনাও প্রকৃতিতে বিরল। মূলত, প্রাণীরা কীভাবে পরিবেশের চাপে ও পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতায় বিশেষায়িত হয়ে উঠতে পারে তার বড় প্রমাণও এই পাখি। বিউসেরোটিডি পরিবারভুক্ত ধনেশ পাখিদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় আফ্রিকার গ্রাউন্ড হর্নবিলস। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা, এশিয়া মহাদেশ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে ধনেশ পাখিদের প্রধান আবাস।

বৈশিষ্ট্য :ধনেশ বিশ্বের একমাত্র পাখি, যার প্রথম দুটি ঘাড়ের হাড় (কশেরুকা) এক্সিস ও এটলাস একে-অন্যের সঙ্গে মিশে আছে, যার মাধ্যমে এসব পাখি লম্বা ঠোঁটকে ধারণ ও বেশি স্থিতিশীল রাখতে পারে। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবেই এদের রয়েছে লম্বা, নিম্নমুখী বাঁকানো উজ্জ্বল বর্ণের ঠোঁট। পুরুষ ধনেশ সব সময়ই বড় হয়ে থাকে। প্রজাতি ও পরিবেশের ভিন্নতার ওপর এদের দৈহিক কাঠামোও নির্ভর করে। বংশবিস্তারেও শারীরিক পার্থক্য দেখা যায়।

ধনেশের প্রধান আকর্ষণ ঘাড়ের মাংসপেশির সহায়তায় মেরুদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত শক্তিশালী ও ভারী ঠোঁট। যে ঠোঁট দিয়ে এরা বিপদ মোকাবিলা, আহার সংস্থান, বাসা তৈরিসহ শিকার করে থাকে। এরা জোড়ায় জোড়ায় থাকতে ভালোবাসে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গাছের গর্তে কিংবা সাগরমুখী পাহাড় পর্বতের গুহায় এরা বাসা বাঁধে। সর্বভুক হিসেবে পরিচিত ধনেশ পাখিরা ফলমূল থেকে শুরু করে ছোট ছোট প্রাণী পর্যন্ত ধরে ধরে খায়।

বনের মালি :গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মহাদেশ প্রধান আবাস হলেও এশিয়া তথা বাংলাদেশে বাস করা ধনেশ পাখিরা বিশেষত বৃক্ষনির্ভর। তাই এরা ফলভোজী। ধনেশরা শুধু বনের প্রাণীই নয়, অরণ্যের প্রাণচক্র বা বাস্তুসংস্থানেরও অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যারা ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয় বন জুড়ে। বিশেষ করে, ডুমুর গাছের বীজ বিস্তারে ধনেশের ভূমিকা অপরিসীম। যে কারণে পাখিটিকে ‘ফরেস্ট গার্ডেনার’ বা ‘বনের মালি’ হিসেবে ডাকা হয়।

মিথ :বিরল প্রেমের পাখি ধনেশকে নিয়ে বিভিন্ন দেশের লোকসংস্কৃতিতে নানা মিথ বা গল্প ছড়িয়ে আছে। মধ্য আফ্রিকায় এই পাখিকে ‘বৃষ্টির দূত’ বলা হয়। তাদের বিশ্বাস, ধনেশ যখন ডাকে তখন বৃষ্টি আসে। পাখিটিকে তারা পবিত্র, শুভ ও আধ্যাত্মিক বার্তাবাহক মনে করেন। ডিম পাড়ার সময় গাছের ফোকরে স্ত্রী পাখির আত্মবন্দি হওয়ার ঘটনাকে আদিবাসীরা দেখেন মাতৃত্ব, আত্মত্যাগ আর পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে। ভারতের নাগা উপজাতির কাছে ধনেশের বিশাল ঠোঁটের গুরুত্ব অনেক বেশি। তারা যোদ্ধার সাহস, শক্তি ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে ধনেশের ঠোঁট আর পালক ব্যবহার করে থাকে।

ইন্দোনেশিয়া ও মালয় সংস্কৃতিতেও ধনেশ আধ্যাত্মিক বার্তাবাহক। তারা বিশ্বাস করে, ধনেশ পাখি পূর্বপুরুষের আত্মার বাহক। যারা বনের ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ায় আর জীবিতদের রক্ষা করে। অনেক অঞ্চলে ধনেশ দেখাকে শুভ সংকেত মনে করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে রাজ ধনেশ দম্পতির একসঙ্গে দীর্ঘকাল বসবাস ও প্রেমময় আচরণকে ‘রাজকীয়’ সম্পর্কের প্রতীক ভাবা হয়।

দেশে মহাবিপন্ন :দেশের পার্বত্য অঞ্চল ঘিরে তিন প্রজাতির ধনেশের দেখা মেলে। এরা হলো—রাজধনেশ, কালো ধনেশ আর গুটিকাগা ধনেশ। এদের মধ্যে রাজধনেশ সবচেয়ে বড়, দৃষ্টিকাড়া পিঠের ওপর সোনালি হলুদ ক্যাস্কবিশিষ্ট। যাদের দেখা মেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর বনাঞ্চলে। তবে রাজধনেশ এখন মহাবিপন্ন পাখির তালিকাভুক্ত। অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির, সাদা ক্যাস্কের ঠোঁট আর সাদা-কালো রঙের মিলিত রূপের কালো ধনেশ সীমিতসংখ্যক দেখা যায় চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও আশপাশের এলাকায়।

দেশে মহাবিপন্ন (বিলুপ্তির চরম ঝুঁঁকি) পর্যায়ে চলে গেছে গুটিকাগা ধনেশ প্রজাতিটিও। বড় আকৃতির গলা ও গলার পাশের লালচে বাদামি রঙের এই পাখির দেখা আগে মিলত পার্বত্য অঞ্চলের গভীর বনে। মূলত, কাঠমজুরি ও কৃষিক্ষেত্রের সম্প্রসারণ, বনাঞ্চলে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি, প্রজনন মৌসুমে ধরা পড়া ও অবৈধ শিকার আর খাদ্য ও বাসস্থানের সংকটের কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে ধনেশ প্রজাতির পাখিগুলো।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী ধনেশ পাখি সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। যেখানে পাখিটি হত্যা, শিকার, বিক্রি বা খাঁচায় রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাজেক, রেমা-কালেঙ্গা ও সীতাকুণ্ডের মতো বনগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ধনেশ পাখির টিকে থাকার জন্য সহায়ক হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়েই ধনেশ পাখি সংরক্ষণ ও মহাবিপন্নের হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেজন্য তারা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ধনেশদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, পুরোনো গাছ সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।

ইত্তেফাক/এএম