রাজধানী ঢাকার বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাকে (ড্যাপ) বাতিল করে নতুন ড্যাপ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট। তাদের দাবি, বিদ্যমান ড্যাপে জলাধার ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ব্যত্যয়, তথ্যের অস্বচ্ছতা ও অপর্যাপ্ততা, বৈষম্যমূলক নগরনীতি এবং পরিবেশ বিপন্নকারী নানা বিষয় রয়েছে যা ঢাকার বাসযোগ্যতাকে আরও তলানির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যার প্রমাণ, গত চার বছরে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৩৮ থেকে ১৭১তম স্থানে নেমে এসেছে।
রোববার (২৭ জুলাই) বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানায়।
‘জনবৈরী ড্যাপ, বৈষম্যপূর্ণ পরিকল্পনা: নিম্ন নাগরিক বাসযোগ্যতা ও বিপন্ন পরিবেশ’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ, সহসভাপতি (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল, সহসভাপতি (জাতীয় বিষয়াদি) স্থপতি নওয়াজীশ মাহবুব, সাধারণ সম্পাদক স্থপতি ড. মাসুদ উর রশিদ, সম্পাদক (পরিবেশ ও নগরায়ন) ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক এবং সম্পাদক (পেশা) স্থপতি এম ওয়াহিদ আসিফ।
ড্যাপের ১২টি আইনগত ও তথ্যগত ত্রুটি তুলে ধরে স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালে পুরান ঢাকার জনঘনত্ব ছিল ৪৫। কিন্তু ড্যাপের প্রস্তাবনায় ২০২৫ সালে এই জনঘনত্ব ৩৬৭ জনের কথা বলা হয়েছে। তাহলে সেখানকার ৮৩ জন কোথায় যাবে? তারা কি বাস্তুহারা হবে? জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ ও সুষম ব্যবস্থাপনা করতে হলে পুরো দেশকে নিয়ে মহাপরিকল্পনা করা প্রয়োজন, যেখানে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনসংখ্যাকে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে। অথচ আর্থসামাজিক, পরিবেশগত ও দুর্যোগ-সংক্রান্ত কারণে একদিকে মানুষকে ঢাকামুখী হতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে ড্যাপে জনঘনত্ব কমানোর কথা বলা হচ্ছে।
স্থপতি ইন্সটিটিউটের সভাপতি আরও বলেন, ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ গেজেটেড হওয়ার আগপর্যন্ত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ কার্যকর ছিল। সেই নিয়মে ঢাকা শহরের সব স্থানে রাস্তার প্রস্থের ওপর ভিত্তি করে একই পরিমাণ ক্ষেত্রফলের ভবন নির্মাণ করা যেতো। অথচ এখন ড্যাপে ঢাকা শহরের ধানমন্ডি, গুলশান ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকাকে আরও অভিজাত করার সুযোগ দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে রায়ের বাজার, বাড্ডা, পুরান ঢাকার মতো এলাকাকে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢাকায় ভবন নির্মাণ হচ্ছে অনুভূমিকভাবে। ছোট ছোট জমিতে ছোট ছোট ভবন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে, সব খোলা জায়গা ও উর্বর কৃষিজমি দালানকোটায় ছেয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ উচ্চ জনঘনত্বের এই নগরে উলম্বভাবে উঁচু ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ জমিতে বেশিসংখ্যক মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা যেতো, যা খোলা জায়গা ও সবুজের আচ্ছাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হতো। হংকং-সহ বিভিন্ন শহরের এমন সফল উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। কিন্তু ঢাকার ড্যাপ সে পথে হাঁটেনি।
স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ড. মাসুদ উর রশিদ বলেন, ড্যাপের খসড়া তৈরির সময় রাজউক স্থপতি ও অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাবনায় গুরুত্ব দেয়নি। একপেশেভাবেই তা তৈরি করেছে। পরবর্তীতে আবার গণশুনানি হলেও সেখানকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপেক্ষা করে ড্যাপকে প্রহসনমূলকভাবে সংশোধন করা হয়েছে।
স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ ড. খুরশিদ জাবিন তৌফিক বলেন, ড্যাপের প্রথম অনুচ্ছেদেই বলা আছে ঢাকার কৌশলগত পরিকল্পনা তিনটি স্তরে হবে। ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান, ঢাকা আরবান এরিয়া প্ল্যান, এবং সবশেষ ধাপে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ। এর মধ্যে শুধুমাত্র তৃতীয় ধাপটি প্রণয়ন করা হয়েছে, প্রথম দুটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনের আরও বক্তব্য দেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি স্থপতি কাজী গোলাম নাসির ও পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি মাহমুদুর রহমান পাপন।
স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বলেন, ড্যাপে জলাভূমি বা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলকে সংরক্ষিত হিসেবে দেখানো হয়নি, বলা হয়নি সেখানে কোনো নির্মাণকাজ করা যাবে না। বরং জিরো ফ্লোর এরিয়া রেশিও দেখানো হয়েছে। সেসব জায়গায় এখন দেদারসে বালু ভরাটের পায়তারা চলছে। ভরাট হওয়া জলাভূমির জমিতে একসময় ঘাস হবে। তখন কেউ কেউ রাজউক-কে বলবে, এই বিস্তীর্ণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ করা হোক। তারপর সেখানে অসংখ্য ভবন হবে। দিনশেষে পরিবেশ বিপন্ন করে দখলদাররাই লাভবান হবে।
স্থপতি মাহমুদুর রহমান পাপন বলেন, ড্যাপ প্রণয়ন করার একক সক্ষমতা নেই রাজউকের। এজন্য আলাদা কনসালট্যান্টকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২ কোটি মানুষের এই ঢাকায় মাত্র কয়েক হাজারের মানুষের সঙ্গে কথা বলে তারা তা প্রণয়ন করে ফেলেছেন। এতে সাধারণ নাগরিকদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেনি। ড্যাপের প্রস্তাবনা আক্ষরিক অর্থে এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যাদের সম্পদ আছে তাদের আরও গড়ার সুযোগ দাও; যাদের তেমন কিছু নেই তাদের অবশিষ্টটুকুও কেড়ে নাও।
সংবাদ সম্মেলনে একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন স্থপতি এম ওয়াহিদ আসিফ। এছাড়া স্থপতি ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে বলা হয়, ড্যাপের সকল তথ্য ২০১৫ সালের উপর ভিত্তি করে রচিত, স্বাভাবিকভাবেই যা ২০২৫ সালের এসে গ্রহণযোগ্যতা হরিয়েছে। ড্যাপের মেয়াদকাল ২০২২ থেলে ২০৩৫ পর্যন্ত হলেও সকল হিসাব ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রক্ষেপিত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, বাকি দশ বছর কী হবে।
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি লিখিত দাবি তুলে ধরেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের নেতৃবৃন্দ। দাবিগুলো হলো: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এর আইনের সঠিক ও যৌক্তিক বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল এবং সহজলভ্য ভূমিব্যবহার মহাপরিকল্পনা; প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সকল দুর্যোগকে বিবেচনায় নিয়ে দুর্যোগসহনীয় মৌজাভিত্তিক ড্যাপ প্রণয়ন প্রক্রিয়া প্রতি পাঁচবছর আবর্তনে পরিচালনা করা; সর্বশেষ গেজেটকৃত ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) স্থগিত করা; ঢাকা মহানগরীসহ পারিপার্শ্বিক গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকা নিয়ে পরিবেশবান্ধব, জনবান্ধব ত্রিমাত্রিক ও তিনধাপভিত্তিক ভূমিব্যবহার পরিকল্পনা করা; দুর্যোগ সহনশীল নগর পরিকল্পনার জন্য 'আরবান ডিজাইন ও ব্যবস্থাপনা' পদ্ধতি সংযুক্ত পূর্বক নতুন ড্যাপ প্রস্তুত করা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, স্থপতি ইনস্টিটিউটের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে রাজউকের সঙ্গে আলোচনা করেও ড্যাপের ভুলত্রুটি সংশোধনের ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি। তাই ঢাকাকে বাঁচাতে, জনদুর্ভোগ এড়াতে, বাসযোগ্য নগর গড়তে ও নির্মাণশিল্পে যুক্ত লাখো মানুষের স্বার্থ রক্ষায় তারা সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছেন।

