জুলাই আহতদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে সুহানা আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশন

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৫, ২১:৫৬

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের রাজপথে নেমে আসে হাজারও শিক্ষার্থী। তাদের দাবি ছিল সম-অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ১৭ বছরের নিপীড়নের অবসান। তারা চেয়েছিল বাংলাদেশকে একটি মুক্ত, ন্যায্য ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠন করতে। 

এই আন্দোলনের সূচনা হয় ছাত্রদের হাত ধরে, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। শিক্ষাঙ্গনের সীমানা পেরিয়ে সব শ্রেনী-পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে। এটি রূপ নেয় এক বিশাল গণআন্দোলনে- একটি অভ‚তপূর্ব গণজাগরণে। এই আন্দোলনের মূল বিন্দু ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। যা পরিচিতি পায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে। জুলাই আন্দোলনে রাজপথ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের মঞ্চ। তরুণেরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করে একটি ন্যায্য ও জনকল্যাণমূলক দেশ গড়ার স্বপ্নে।

ছাত্রদের আন্দোলনটি শেষ হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। তবে তার আগেই ঝরে যায় অনেক তরুণ প্রাণ। অনেকেই আহত হয়, বদলে যায় তাদের জীবনের গতিপথ। এই সংকটের মূহুত্বে জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ায় সুহানা অ্যান্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ফাউন্ডেশনের ১১৭ জন স্বেচ্ছাসেবক ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুরসহ প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ছুটে যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনে আহতদের খুঁজে বের করা এবং তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। 

হাসপাতালগুলোর মধ্যে ছিল- নিটোর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট উইমেনস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সুহানা অ্যান্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকেরা আহতদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত ২৭২ জন গুরুতর আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, ওষুধ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। কিন্তু এখানেই তাদের ভূমিকা থেমে থাকেনি, বর্তমানে ফাউন্ডেশনটি বিভিন্ন কুরিয়ার ও অনলাইন ডেলিভারি সংস্থায় আহতদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। 

২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত, সুহানা অ্যান্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশন ১০০ জন আহত ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিকে নিয়মিত মাসিক আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। একইসঙ্গে তারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ২৫ জন আহত শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ শিক্ষাবৃত্তির আওতায় আনার জন্য কাজ করছে। এটি কোনো এককালীন সাহায্য নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। 

এ বিষয়ে ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-চেয়ারম্যান আনিস আহমেদ বলেন, “ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের পাশে থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তারাই তো ১৭ বছর পর আমাদের স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা আহতদের পাশে আছি নিরবে, কিন্তু অটলভাবে।

তিনি বলেন, এই সহায়তা শুধু সংখ্যা নয়- প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একজন মানুষের কষ্ট, লড়াই আর সাহসের গল্প।

কুষ্টিয়ার বাসিন্দা সারোয়ার ১৮ জুলাই মিরপুর-২ এলাকায় চোখে গুলিবিদ্ধ হন। ফাউন্ডেশনের তাৎক্ষণিক সহায়তায় তিনি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পেরেছেন। ফরিদপুরের একজন গাড়িচালক, সুজন মোল্যা, ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় কোমরে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জানান, মাসিক সহায়তা দিয়ে তিনি নিজের চিকিৎসা ও মেয়ের পড়াশোনার খরচ মেটাচ্ছেন।

মিঠুন, একজন ডেলিভারিম্যান, যিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি বলেন, এই আর্থিক সহায়তা তার পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালাতে সাহায্য করছে। জুয়েল, গাজীপুরের গোপীবাগ রেলগেট এলাকার একজন বাসিন্দা। এই সহায়তা দিয়ে তিনি তার মেয়ের চিকিৎসা ও বাড়ির খরচ মেটাচ্ছেন। 

নেসার উদ্দিন, মাদারীপুরের কালকিনির রমজানপুর গ্রামের শিক্ষক, ১৯ জুলাই বনশ্রী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। তিনি এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। 

এইচএসসি ২০২৫ পরীক্ষার্থী আবদুল্লাহ আহমেদের বাবা শাহাদাত হোসেন মুন্না জানান, ফাউন্ডেশনের এককালীন সহায়তা তার ছেলের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচে বড় ভ‚মিকা রেখেছে। লক্ষীপুর চকবাজারে ৪ আগস্ট আহত জুবায়ের হাবিব জানান, ফাউন্ডেশনের সহায়তা তাকে পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালাতে সহায়তা করেছে।

আজমপুরে চোখে গুলিবিদ্ধ এসএসসি ২০২৫ পরীক্ষার্থী জুলফিকারের ভাই জানান, ফাউন্ডেশনের এককালীন সহায়তা তাদের সংসার চালাতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। 

তামজিদ হোসেন জনি, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাসিন্দা, ৫ আগস্ট পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জানান, এই মাসিক সহায়তা তার চিকিৎসা ও পরিবারের খরচে কাজে আসছে এবং তিনি একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন। 

জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা পারভেজ আলী, আন্দোলনে জয়দেবপুরে আহত হন। তিনি জানান, এই সহায়তা দিয়ে ওষুধ ও সংসারের খরচ চালাতে পারছেন। এই সহায়তা প্রাপ্ত সকলেই সুহানা অ্যান্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

আহতদের কেবল চিকিৎসা নয়, সুহানা এন্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশন দেশের স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, নারীর ক্ষমতায়ন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫টি ফোটোথেরাপি মেশিন ও ৮টি ইনকিউবেটর প্রদান করেছে, আইসিডিডিআরবি-কে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করছে, এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটকে সহায়তা করেছে। 
স্বাস্থ্যসেবার বাইরেও, ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি, এতিমখানা সমর্থনের মতো সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমে জড়িত। সুহানা এন্ড আনিস আহমেদ ফাউন্ডেশনের এই কার্যক্রম শুধুই সেবা নয়, এটি দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি আশার আলো, যাদেও জীবন উন্নত করার অঙ্গীকার নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। 

ইত্তেফাক/এএইচপি