ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে মার্জারের পাশাপাশি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা হবে: গভর্নর

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৫, ০৭:০০

বেসরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমল। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর সরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এই মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই নীতি ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা উল্লেখযোগ্য।

গভর্নর বলেন, ‘এ মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। আশা করা যাচ্ছে, সামনে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা যাবে। আগের থেকে মূল্যস্ফীতি কমেছে।’

নতুন মুদ্রানীতিতে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতিকে ৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১.৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামলে এবং নীতি সুদের হার ৩ শতাংশে পৌঁছালে পর্যায়ক্রমে সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং বাজারের স্থিতিশীলতা আনা এই মুদ্রানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। মে ২০২৫ থেকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করার ফলে রিজার্ভ স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য হয়েছে বলে গভর্নর উল্লেখ করেন। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন দুবার রেফারেন্স রেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত কার্যকর রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। গভর্নর বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো রক্ষণাত্মক অবস্থানে আছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে, যা রপ্তানিতে ঝুঁকি তৈরি করছে। দেশের অভ্যন্তরেও আগামী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ধীর বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর মুদ্রানীতি অপরিহার্য।

ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, খেলাপি ঋণের হার কমাতে শীঘ্রই ঝুঁকিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে, যা জানুয়ারি ২০২৬ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে। এছাড়া, অডিটেড কোয়ালিটি রিভিউয়ের ভিত্তিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গভর্নর উল্লেখ করেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার মার্জারের পাশাপাশি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করবে এবং ব্যাংক পরিচালনায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে। যেসব ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭.২০ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ৯.৮০ শতাংশ। অন্যদিকে, সরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ২০.৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ১৭.৫০ শতাংশ। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য এবং বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট থাকবে। গভর্নর জানান, ব্যাংক খাত থেকে ডলার কেনার কারণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বাজারে প্রবেশ করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে।

চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে গভর্নর বলেন, এই মৌসুমে এটি অপ্রত্যাশিত। সরকার ৪ লাখ টন চাল আমদানির প্রক্রিয়ায় আছে এবং প্রয়োজনে আরো বেশি আমদানি করা হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, চালের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ নয়, তবে বিনিয়োগ বাড়বে।

সামগ্রিকভাবে, নতুন মুদ্রানীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। এই নীতিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি সঠিক পথে ফিরে আসবে বলে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর আশাবাদী।

ইত্তেফাক/এএম