দলীয় পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন সরিয়ে নেওয়ায় রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বিএনপির এক নেতা ‘ধমকাচ্ছেন’ এমন একটি অডিও ভাইরাল হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) ওই অডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাবেক বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী কে এম জুয়েল এবং ইউএনও ফয়সাল আহমেদের মধ্যে এই কথোপকথন হয়।
জানা গেছে, উপজেলা সদরের সড়ক বিভাজকে থাকা বিভিন্ন দলের ফেস্টুন অপসারণ করেন ইউএনও ফয়সাল আহমেদ। এরই প্রেক্ষিতে ইউএনওকে ফোন করে এসব কথা বলেন জুয়েল। পরে ২ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ওই অডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়া ওই কল রেকর্ডে শোনা যায়, ইউএনওকে উদ্দেশ্যে করে বিএনপি নেতা জুয়েল বলছেন- ‘আজকে একটা ঘটনা ঘটেছে, আমি শুনেছি। আমি ইঞ্জিনিয়ার কেএম জুয়েল বলছি, সম্ভাব্য ক্যান্ডিটেট। আপনার গোদাগাড়ী থানার প্রোপারে যে পোস্টার সরিয়েছেন, এই বিষয়ে কিছুক্ষণ আগে আমাকে ইনফর্ম করা হয়েছে। সেখানে আমার পোস্টার ছিল। জামায়াত-বিএনপির পোস্টার ছিল। আপনি যে হটাইছেন, এর কারণ কি? কোন পরিপত্র আছে? না ইচ্ছে করে?’
জবাবে ইউএনও বলেন, ‘জনগণ অভিযোগ দিয়েছে।’ জুয়েল পাল্টা বলেন, ‘জনগণ তো অনেক অভিযোগ দিয়েছে। সমগ্র গোদাগাড়ী থানাতে ভর্তি হয়ে আছে পোস্টার। তোলেন, সব তোলেন।’
এসময় ইউএনও কিছু একটা বলতে চাইলে তাকে থামিয়ে দিয়ে জুয়েল বলেন, ‘শোনেন, আমি যেটা বলছি লিগ্যাল রাইট নিয়ে বলছি, সেটার সঠিক অ্যানসার করবেন। আপনি কেন ওই জায়গার পোস্টার তুলেছেন, আর অন্য জায়গার তুলছেন না কেন? আমি ঢাকাতে আছি, আমি আসতেছি।’
ইউএনও বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ জুয়েল বলেন, ‘না, আপনি যেখান থেকে পোস্টার তুলেছেন, সেখানে আপনি সাবমিট করবেন পোস্টার।’ কথা না বাড়িয়ে ইউএনও বলেন, ‘ঠিক আছে।’
এ সময় আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপি নেতা জুয়েল বলেন, ‘কালকে যেন আমরা ওখানে দেখতে পাই, পোস্টার যেখানে ছিল। ঠিক আছে মানে কি? অবশ্যই করবেন। না হলে যেটা করা দরকার সেটাই করব। আপনার এগেইনেস্টে যেই রকম স্টেপ নেওয়া দরকার, সেটাই আমি করব। বিশেষ করে আমরা করব। আমার নেতার ছবি তুলেছেন আপনি ওখান থেকে। জাস্ট রিমেম্বার ইট।’
জুয়েল বলতে থাকেন, ‘নরসিংদী বাড়ি দেখান আপনি, না? কোন দল থেকে আসছেন আপনি? কোন দল থেকে এসেছেন? কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেছেন আপনি? কালকে পোস্টার ভদ্রলোকের মতো লাগাবেন। ফাইজলামি! এহ, বিশাল ব্যাপার। উনি টিএনও হয়ে গোদাগাড়ীতে আসছেন।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ইউএনও ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ডাইংপাড়া মোড়ে ব্যানার ফেস্টুন এ রকম পর্যায়ে ছিল যে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। পাশাপাশি পৌরসভার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল বলে অভিযোগ ছিল। স্থানীয় জনগণ এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছে। সে প্রেক্ষিতে পৌরসভা থেকে নোটিশ দেয়া হয়েছে সরানোর জন্য। দুই-তিনবার মৌখিকভাবে ও লিখিত আকারেও জানানো হয়েছিল। না সরানোর কারণে ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে পৌরসভায় রাখা হয়েছে।’
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির একাধিক সভাতেও আলোচনা হয়েছিল। সেখান থেকে সব রাজনৈতিক দলের পোস্টারই পৌরসভার পক্ষ থেকে সরানো হয়েছে। তবে বিএনপি নেতা কে এম জুয়েলের ফোনে শাসানোর বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতা কে এম জুয়েল বলেন, ‘ইউএনওর কাছে জনগণ অভিযোগ করেছে, আর আমরা কি মানুষ না? আমরা জানোয়ার? আমার ছবি তুলে ফেলুক আপত্তি নাই। আমার নেতার ছবিতে হাত দিয়েছে কেন? তার কাছে কি নির্বাচন কমিশন থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পোস্টার তুলে ফেলতে? তিন মাসের মধ্যে কি নির্বাচন? উনি জাস্টিস করতেন, আমার কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু গরু-ছাগলের মতো আচরণ করবেন, তা তো হয় না।’
বিষয়টি নিয়ে কোথাও আলোচনা হয়নি, ইউএনও কোন চিঠিও দেননি দাবি করে এই বিএনপি নেতা বলেন, আমার এক লোককে ডেকে ইউএনও বলেন, যেখানে পোস্টার ছিল, দয়া করে আপনারা লাগিয়ে নেন। কিন্তু আমরা তো লাগাব না। ইউএনওকেই লাগাতে হবে।
উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির একজন সদস্য জানান, প্রায় দুইমাস আগে উপজেলা সদরের এসব ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করেন এক ব্যক্তি। এর একমাসেও সেগুলো অপসারণ না হওয়ায় পরবর্তী মাসের সভাতেও বিষয়টি আলোচনায় ওঠে। ওই সভায় ট্রাফিক পুলিশ আপত্তি করেছিল যে, ফেস্টুনের কারণে রাস্তার একপাশ থেকে অন্যপাশ দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে। এ দুটি সভার মধ্যে প্রথম সভায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম শাওয়াল ছিলেন না। দুই সভার মাঝে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি পুনর্গঠন করা হলে তিনি পরবর্তী সভায় উপস্থিত ছিলেন।
তবে কোনো আলোচনা হয়নি দাবি করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম শাওয়াল বলেন, ‘আমি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য। পোস্টার নিয়ে কোনো আলোচনা সভায় হয়নি। ইউএনও আমাদের না জানিয়ে এভাবে ফেস্টুন অপসারণ করে ঠিক করেননি। সেখানে আমাদের নেতার ছবি ছিল।’
