বাচ্চা ইঁদুর কুটুস

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৯, ১৯:৪৮

খুব বড় একটা নদী দিয়ে যেতে যেতে যেতে তবেই ওই শিমুল গাছটা পাওয়া যাবে।

নদী থেকে বেশি দূরে নয়, আবার একেবারে কাছেও নয়। হোগলা বনের ধারে যেখানটায় আর কোনো বড় গাছ নেই, সেখানে মনের আনন্দে নিজের ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে দিতে দিতে আর আকাশের দিকে বাড়তে বাড়তে ওই উঁচুতে পৌঁছে গেছে শিমুল গাছের মগডাল। যেন আকাশই ছুঁয়ে ফেলবে। সেখানে কেউ উঠতে পারবে না। তবে কেই বা যাচ্ছে সে গাছে উঠতে! জায়গাটার চারদিকটা একেবারে বিরান। কেউ যায়ও না ওদিকে। মাঘ মাসে যখন আগুনরঙা শিমুল ফুল ফুটে আকাশের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়, তখন দূর গ্রাম থেকে কিংবা নদীপথে যেতে যেতে অনেকের চোখে পড়ে, তবে দেখাই সার, কাছে কেউ যায় না। এমনকি চৈত্রমাসে যখন শিমুল ফল ফটাফট শব্দ করে ফেটে ধপধপে সাদা তুলো হয়ে উড়তে থাকে চারদিকে, তখনো কেউ সেখানে যাওয়ার কথা কখনো ভেবেছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। তোমরা শুনেছ কি?

আচ্ছা শুনে থাকলে শুনেছ, কিন্তু ওই গাছে যে কুটুস নামের একটা ছোট্ট ইঁদুর আর মা ধাড়ি ইঁদুর থাকে এটা নিশ্চয়ই জানো না। এটা সেই কুটুসেরই গল্প।

তবে কুটুসের কথা বলার আগে আরো একটা কথা বলে নিই। শিমুল গাছের ওই ওপর দিকের ডালে এক ঈগল পরিবারের বাসাও রয়েছে। ভাবছ তা কী করে হয়? ঈগল তো ইঁদুর দেখলেই ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। তা ঠিক, ঈগল আর ইঁদুরের সম্পর্কটা এই রকমই বটে। তবে কিনা এদের বেলায় ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। দুই পরিবারের মধ্যে দারুণ ভাব। একেবারে গলায় গলায় বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব তৈরি হয় যখন, তখন কুটুসের জন্ম হয়নি।

তখন কুটুসের মা ধাড়ি ইঁদুর অনেক দূরের এক গ্রামে থাকত। একদিন কুটুসের মা ধাড়ি ইঁদুর কি  একটা কাজে ছুটছিল জোর কদমে। হঠাত্ই দেখে একটা ঈগল পাখি মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। তা দেখে ধাড়ি ইঁদুর মনে মনে খুশিই হয়। বেশ হয়েছে, ঈগল কখনো ইঁদুরকে খাবার ছাড়া আর কিছু ভাবে না। যত লুকিয়ে চুরিয়েই ইঁদুরেরা যাওয়া আসা করুক না কেন, ওই উঁচু গাছের ডালে বসে থেকেও তা ঈগলদের চোখ এড়ায় না। আর যদি দেখতে পেল তবে আর রক্ষা নেই। দেখ না দেখ বুঝে ওঠার আগেই গোত্তা মারা ঘুড়ির মতো সাত্ করে নেমে এসে দু পায়ের বড় বড় নখে গেঁথে নিয়ে যাবে নিজের বাসায়। তারপর বাঁকানো বড় শক্ত ধারালো ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে খেয়ে ফেলতে দেরি করে না মোটে। ঈগলদের থেকে এক শ হাত দূরেই থাকতে হয় ইঁদুরদের। ধাড়ি ইঁদুর তাই ঈগলের বিপদ দেখেও না দাঁড়িয়ে চলেই যাচ্ছিল, খানিক চলে যাবার পর হঠাত্ তার কেমন যেন লাগে। নিশ্চয় ফাঁদ পেতে ঈগলকে ধরেছে দুষ্টু ছেলের দল। ইঁদুর ধরার জন্যও ওরা ফাঁদ পাতে। যদি সে কোনোদিন ফাঁদে পড়ে তবে পিটিয়ে থেঁতো করে মারবে নয়তো আগুনে ছুড়ে দেবে। মাঠের ফসল আর ঘরের চাল-গম ইঁদুরেরা খেয়ে ফেলে বলে মানুষের খুব রাগ তাদের ওপর। ঈগলকেও ছাড়বে না, ঈগল যে মানুষের মুরগির ছানা ছোঁ দিয়ে তুলে নেয় সুযোগ পেলেই, এখন তার শোধ নেবেই তারা। ধাড়ি ইঁদুরের খারাপ লাগল। সে ফিরে এসে দেখে ঈগলের ডানা দুটো মুচড়ে বাঁধা। ঈগলের বেশ কষ্ট হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে। ঈগল ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁধন খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু বাঁধনটা নাগালে পাচ্ছে না। নাগালে পেলে ঠোঁট দিয়ে বাঁধন কাটতে তার এতটুকু দেরি লাগত না। ধাড়ি ইঁদুর আরো একটু এগিয়ে গিয়ে ঈগলকে ভালো করে পরীক্ষা করল। মনে হচ্ছে, মারধোর খেয়েছে বিস্তর, একেবারে নেতিয়ে পড়েছে। দেখে আরো একটু সাহসে এগিয়ে যায় ধাড়ি ইঁদুর। ঈগল তার দিকে করুণ চোখে তাকায়। আহারে, এই চোখে কি ধারই না থাকে, দশ মাইল ওপর থেকে ইঁদুর-বেজির ঘোরাফেরা দেখে ফেলে! সেই চোখে এখন পানি টলটল করছে। ইঁদুর মওকা পেয়ে একটু করুণা করেই বলে, ‘তা সাহায্য লাগবে নাকি?’

ঈগল মাথা নাড়ে। ‘দাও না আমার বাঁধনটা কেটে।’ বলে সে।

‘হ্যাঁ, দিই আর কি। আর তুমি খপ করে ধরে গপ করে গিলে খাও আমাকে।’

‘বিশ্বাস করো, কক্খনো তোমাকে কিছু করব না।’

‘সত্যি বলছ?’

‘সত্যি বলছি।’

‘তিন সত্যি করো।’

‘সত্যি সত্যি সত্যি।’

তবু ধাড়ি ইঁদুর ভয়ে ভয়েই ঈগলের চওড়া পিঠে উঠে যায়। তার ধারালো দাঁত দিয়ে এদিক ওদিক কুটকুট করতেই দড়িটা খসে পড়ে ঈগলের ডানা থেকে। ঈগল বিশাল ডানাদুটো মেলে দিয়ে ঝাপটা দেয় বার কয়েক। তারপর ইঁদুরকে বলে, ‘চলো আমরা দূরে চলে যাই। এখানের মানুষগুলো বেশ দুষ্টু, তারা তোমাকেও ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না।’

ঈগল তার নখরে ইঁদুরকে যখন আটকে নেয় তখন সত্যি খুব ভয় করছিল। কিন্তু না, ঈগল বিশ্বাসঘাতকতা করতে জানে না। সে লাল ফুল ভরা শিমুল গাছটা বসবাসের জন্য পছন্দ করে। ইঁদুরকে গাছের গোড়ায় যত্নের সঙ্গে নামিয়ে দিয়ে পাখা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম।’

আর একবার, বৈশাখ মাসে, শিমুল ফল ফেটে তুলো হয়ে উড়ে যাওয়ার পরে ঈগলের দুটো বাচ্চা ডিম ফুটে বেরিয়েছে, তখনো গায়ের পালক বড় হয়নি, বাবা-মায়ের এনে দেওয়া খাবার খায়—এমন একদিন সকাল সকাল আকাশ কালো করে মেঘ জমে ঝড় বইতে শুরু করল। এমনই ঝড়—মনে হলো পৃথিবীই উল্টে যাবে। চারদিক থেকে গাছ ভেঙে ভেঙে পড়তে থাকল। ছোট কুটুসকে নিয়ে তার মা অবশ্য তাদের গাছের খোড়লের বাসায় বেশ নিরাপদেই ছিল। শিমুল গাছ অনেক বয়সী গাছ, গোড়াটাও খুব মজবুত করে মাটিতে ঢুকে আছে, উপড়ে যাওয়ার সম্ভবনা কম। ধাড়ি ইঁদুর চিন্তা করছিল ঈগলদের ছোট ছোট ছানা দুটোর কথা। ওরা এখনো উড়তে শেখেনি। এই ঝড়ে তারা কি বাসায় টিকতে পারছে?

ঠিক যা ভেবেছিল, ঝড় থেমে যাওয়ার পর কুটুসের মা দেখে—ঈগলের দুটো বাচ্চাই মাটিতে পড়ে আছে। সে তাড়াতাড়ি করে ওদের পিঠের ওপর থেকে ডালপালা দাঁতে কেটে, টেনে সরিয়ে বের করে। ঈগল পাখি ছুটে এসে হাত লাগায় তার সঙ্গে, কিন্তু ততক্ষণে একটা বাচ্চা মরে গেছে। অন্য বাচ্চাটার একটা ডানায় জোর আঘাত লেগেছে। ঈগল আলতো করে বাচ্চাকে তুলে নিয়ে যায়। সেই থেকে ঈগল পাখির ছেলেটার একটা ডানা একটু দুর্বল। বেশিদূর উড়তে পারে না। বাসায়ই থাকে, খুব বেশি হলে শিমুল গাছের এ ডাল ও ডাল উড়ে বেড়ায়।

ধাড়ি ইঁদুর সমস্যায় পড়েছে ঈগলের এই ডানাভাঙা ছেলেকে নিয়েই। কুটুস ওকে বিয়ে করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিয়ে করে কুটুস ঈগলদের ওই মগডালের বাসায় গিয়ে থাকবে। কুটুসের মা বলে, ‘ও তো তোকে একটু খাবারও জোগাড় করে দিতে পারবে না খাওয়ার জন্যে। ও নিজেই এখনো বাপের হোটেলে খায়।’ কুটুস শুনে উত্তর দিয়েছে, ‘না পারুক, আমিই ওকে খাবার জোগাড় করে দেব। ও খুব ভালো। গাছের ওপর থেকে আমার দিকে লক্ষ রাখে কোনো বিপদে যেন না পড়ি। সেরকম দেখলে জোরে চেঁচিয়ে আমাকে সাবধান করে দেয়। যেমন তোমাকে দেয় ওর বাবা।’

‘কিন্তু সে তো শুধু আমার বন্ধু, আমি তো তার সঙ্গে সংসার করি না। পাখির সাথে প্রাণীর সংসার হয় কীভাবে।’

কুটুস একগুঁয়েভাবে বলে, ‘করলেই হবে। দেখো আমার সংসার খুব সুখের হবে।’

কুটুসের মা তাবদা মেরে থাকে। একে বলে ঈগলের সঙ্গে ইঁদুরের বিয়ে, তাই ডানাভাঙা পাত্র, গোত্রছাড়া কারবার যাকে বলে! কোন মায়েরই বা প্রাণে ধরে এরকম বিয়ে মেনে নেয়? তাই এ নিয়ে মা-মেয়ের মন কষাকষি চলছে বেজায়।

ঈগল আর ইঁদুরের বিয়ের দাওয়াত যেহেতু আমরা পাচ্ছি না তাই ওদের মন কষাকষি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমাদের কোনোই লাভ নেই। যা করার ওরাই ঠিক করুক, না কি বলো তোমরা? হয়তো সত্যি একদিন শোনা যাবে—ইঁদুরছানা কুটুস আর ঈগলছানা অতঃপর সুখে সংসার করিতে লাগিল।