বিবর্তনের ধারায় শেষে আসা নীল রং তৈরি করা কঠিন বলে পৃথিবীতে নীল ফুলের সংখ্যা খুবই কম। তাই দুর্লভ নীল ফুলের কথা ভাবলেই সবার আগে আসে অপরাজিতার নাম। হাজার বছর ধরে মানবমন ও শিল্প-সাহিত্যে স্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা, আধ্যাত্মবোধের প্রতীক হয়ে আছে নীল রং। তাই অপরাজিতার নীলে কবিমন বিলীন হবে না, তা কী করে হয়!
অপরাজিতার নীলে হারিয়ে গিয়েই তো রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে/ অপরাজিতার মতো নীল হয়ে—আরো নীল—আরো নীল হয়ে/ আমি যে দেখিতে চাই...।’ নিজেকে অপরাজিতা ভেবে দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন, ‘আমি বিজন বনের অপরাজিতা/ আমার কথা কহি গানে...।’
তবে অপরাজিতা শুধু সৌন্দর্য আর নিঃসঙ্গতার বার্তাই বহন করে না, ইতিহাসে নারীশক্তি আর পবিত্রতারও প্রতীক হয়ে আছে। অপরাজিতার নীল রং মনের অতলে নাড়িয়ে দেয়, অপরাজেয় গানের সুর তোলে, অসীম মহাশূন্যের হাতছানি দিয়ে যায়। শুধু কি তাই? মনকাড়া ফুলটি সুপ্রাচীনকাল ধরে আয়ুর্বেদশাস্ত্রে সুস্থতা ও সৌন্দর্য ধরে রাখার দাওয়াই হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। গাছটির বীজ, পাতা, ফুল আর মূল আধুনিক হারবাল আর ইউনানি চিকিত্সায় দারুণ ভূমিকা রাখছে।
ইতিহাস :অপরাজিতা গাছ ফ্যাবেসি (ডালজাতীয় গাছ) পরিবারের সদস্য। যে পরিবারের উত্পত্তি ঘটেছে প্রায় ৫ কোটি বছর আগে। গবেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে বিবর্তন ধারায় প্রথম জন্ম নিয়েছে গাছটি। পরে বিস্তার ঘটে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। এমনকি ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে অপরাজিতাগাছ ছড়িয়ে যায় সুদূর আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা অঞ্চলে। বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের রঙে দেখা যায় বৈচিত্র্য। পরিবেশের ভিন্নতা অনুযায়ী ধারণ করে নীল, সাদা, বেগুনি রং।
আগে দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই চোখে পড়ত অপরাজিতা ফুল। এখন কমে গেছে। ঝাড় বা জঙ্গল থেকে অপরাজিতা এখন উঠে এসেছে বাড়ির উঠোনে, ছাদবাগানে। রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার পার্বত্য এলাকায় ফুল আর গাছ ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। রাজধানীর ছাদবাগানে আগের চেয়ে চাষ বেড়ে গিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। শীত ও বর্ষা দুই মৌসুমেই ফোটা অপরাজিতার ব্যবহার বাড়ছে গৃহসজ্জাতেও। চট্টগ্রাম মহানগরী আর রাজশাহীর পল্লি এলাকায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে ফুলটি।
নামকরণ ”দেশ ও অঞ্চলভেদে ভাষা, সংস্কৃতি ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে অপরাজিতা ফুল বিভিন্ন নাম ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতে ‘অপরাজিতা’ নামটি ব্যাপক জনপ্রিয়। এই ফুলকে হিন্দিতে বলা হয় ‘শঙ্খপুষ্পি’, তামিল ভাষায় ‘শংগুপু’, থাইল্যান্ডে ‘ডকআনচান’, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ‘বুঙ্গাতেলাং টেলাং’, ভিয়েতনামে ‘হোয়াদাউবিয়েক’, চীনে ‘লানহুদিয়েহুয়া’ আর ফিলিপাইনে বলা হয় ‘পুকিংগান’। ফুলটি দেখতে প্রজাপতির মতো হওয়ায় ইংরেজি নাম ‘বাটারফ্লাই পি’। যেখানে ‘পি’ এসেছে ডালপরিবারভুক্ত গাছ হিসেবে।
অপরাজিতার বৈজ্ঞানিক নাম ‘ক্লিটোরিয়া টারনাটিয়া’, যার অর্থ ‘টারনেট দ্বীপের নারী-ফুল’। সুইডিশ উদ্ভিদবিদ কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৩ সালের দিকে তার লেখা ‘স্পিসিস প্লান্টারাম’ বইয়ে প্রথম অপরাজিতার এই নাম দেন। কারণ, ফুলটির পাপড়ি ও কেন্দ্রীয় অংশ দেখতে নারীর ক্লিটোরিসের মতো মনে হয়েছিল লিনিয়াসের কাছে।
তবে অনেকের মতে, পর্তুগিজ পর্যটকরা প্রথম ফুলটির আকৃতি দেখে নামটি দিয়েছিলেন। পরে লিনিয়াস তা গ্রহণ করেন বৈজ্ঞানিকভাবে, যে সময়ে বৈজ্ঞানিক নামকরণে বর্ণনামূলক ধারা প্রচলিত ছিল। তাছাড়া নাম পরিবর্তন কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বিতর্ক থাকলেও নারীর অঙ্গের নামেই টিকে গিয়েছিল। ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম রাখার ক্ষেত্রে এর গঠন, রং, উত্সস্থান বা আবিষ্কারকের নাম ব্যবহার করা হয়। ফুলের গঠন ও উত্সস্থান দুইই প্রাধান্য পেয়েছে ‘ক্লিটোরিয়া টারনাটিয়া’ নামটিতে।
বৈশিষ্ট্য :অপরাজিতা বহুবর্ষজীবী, লতানো, নরম কাণ্ডের ঔষধি গাছ। শুধু নীল ফুলের সৌন্দর্য বা ভেষজ গুণই নয়, পরিবেশ সহনশীলতার কারণে অপরাজিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফুল সাধারণত নীল হয়। তবে সাদা, হালকা বেগুনি প্রজাতিরও দেখা যায়। ফলের আকার মাঝারি। মাঝখান ফাঁপা ও পাপড়ি ঘোরানো। পাতা যৌগিক গাঢ় সবুজ। প্রতিটিতে সাধারণত পাঁচ-সাতটি ছোট উপপত্র থাকে। ফুল ঝরে গেলে পাতলা লম্বাটে শুঁটি হয়। প্রতিটি শুঁটিতে ৫-১০টি বাদামি রঙের বীজ থাকে, যা থেকে বংশবিস্তার হয়। যে কোনো ধরনের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে জন্মাতে পারে। পলি ও বেলে মাটি সবচেয়ে উপযোগী। বেশি রোদের জায়গা পছন্দ করে। পানি কম থাকলেও বাঁচে। তবে বেশি ফুল পেতে হলে নিয়মিত পানিসেচ দিতে হয়।
নারীশক্তির প্রতীক :সংস্কৃত থেকে আসা ‘অপরাজিতা’ নামের অর্থ ‘যাকে পরাজিত করা যায় না’। এই নাম নারীর শক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক। অনেক গ্রামে অপরাজিতাকে ‘দেবীরূপে’ বিবেচনা করা হয়। আধুনিক সাহিত্যেও অপরাজিতা এসেছে নারীর প্রতীক হিসেবে। যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ভেঙে না পড়ে বরং শক্ত হয়ে দাঁড়ান, যিনি অজেয়। বিয়ের সময় বা পূজার আগে মেয়েদের হাতে ফুলটি তুলে দেওয়া হয়, যাতে তিনি সদা শক্তিমান, অজেয় ও ধৈর্যশীল থাকেন।
দুর্গাপূজার দশমী বা নবমীতে ‘অপরাজিতা পূজা’ হয়। অপরাজিতা ফুল দিয়ে ‘কল্পনা’ নামে এক নারীকে দেবীর রূপে পূজা করা হয়। ফুলটির গঠন অনেক সময় নারীর শরীরের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাছাড়া নীল রং অনেক সংস্কৃতিতে অন্তর্দৃষ্টি, গাম্ভীর্য ও জ্ঞান—এই নারীবিষয়ক গুণগুলোর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। গ্রামীণ মেয়েরা ফুলটি চুলে গুঁজে নেয়, যা শক্তি, সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
অপরাজিতা চা :আধুনিককালে স্বাস্থ্যসচেতনদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ডিটক্স-চা বা অপরাজিতা ফুলের চা। এটা নীল চা নামেও পরিচিত, যা ক্যাফেইনমুক্ত, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ ভেষজ চা। হজমে সাহায্য করে, রক্তে শর্করার মাত্রা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করে, শরীরে জ্বালাপোড়া কমায়, অ্যাজমা প্রতিরোধে সহায়ক। তাছাড়া অপরাজিতা চা রক্তনালিকে শিথিল করে, যা রক্তচাপ কমাতে ও হূদেরাগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
শুধু তা-ই নয়, নীল চা লিভারের এনজাইমের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে লিভার সুরক্ষা পায়। অপরাজিতা ফুল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদানসমৃদ্ধ হওয়ায় এর থেকে তৈরি নীল চা অ্যালার্জি, ফুসকুড়ি ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। তাছাড়া নীল চা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। মনকে শান্ত করে। মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হয়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন দিক থেকে উপকার মেলে।
উপকারিতা :শরীরের জন্য অপরাজিতার ফুল, লতা, পাতা, শিকড়ের উপাদান খুবই উপকারী। ফুলটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ও ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। অপরাজিতায় থাকা স্যাপোনিন ও ফ্লাভোনোয়িড যৌগ অ্যাজমা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফুলে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন শরীরে ফ্রি রেডিক্যাল তৈরিতে বাধা দেয়, যা ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আলঝেইমার রোগের চিকিত্সায় অপরাজিতা ব্যবহার করেন চিকিত্সকরা। ফুলটি স্মৃতিশক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে।
শুধু তা-ই নয়, অপরাজিতা রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডস, কোলেস্টেরল ও এলডিএলের পরিমাণ হ্রাস করে। ফলে হূদ্রোগের ঝুঁকি কমে। বয়ঃসন্ধিকালীন উন্মাদ রোগ, গলগণ্ড রোগ, ফোলা রোগ, ঘন ঘন প্রস্রাব, স্বরভঙ্গ, শুষ্ক কাশি, আধকপালে ব্যথা ইত্যাদি রোগে অপরাজিতার মূল, ফুল পাপড়ি, গাছের লতাপাতা, মূলের ছাল ও বীজ ব্যবহার হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুল, মূল, বীজ থেকে তৈরি রস এক/দুই চামচের বেশি সেবন করা যাবে না।
