শুধু এলাচের খুশবু! ধন্দ লাগল, উনার কি সবসময় দাঁত ব্যথা থাকে, তাই এলাচ অথবা লবঙ্গ-তেল ব্যবহার করেন। নাহ, তা তো হবার নয়, কারণ এ শহরে বেদেনিদের ‘দাঁতের পোকা খসাই’ চিকিত্সা থেকে দেঁতো-বৈদ্যদের ‘ব্যথাহীন দন্ত উত্পাটন’ সবই আছে, তাই এত দীর্ঘদিন দাঁত ব্যথা পুষে যাওয়ার ধৈর্য থাকার কথা নয়। তাহলে বিষয়টা কী? এলাচগন্ধি কোনো পারফিউমের তালাশও পাওয়া গেল না, শ্যাম্পু-সাবান কিস্সু না। শেষে বোঝা গেল, উনার নাকফুলটি ছোট্ট একটা গোলাকার বক্স, যার ভেতর অসংখ্য ছোট ছোট ফুটো। সেই বক্সের ভেতর কখনো এলাচদানা, কস্তুরিদানা, কর্পূরের দানা, কিংবা ফুলের নির্যাস, অথবা জর্দার পরমাণু, নেবুর ফুল, আতা ফুল, পুদিনার পাতা, ইউকিলিপটাসের পাতা ইত্যাদি পুড়ে রেখে উনি সারাক্ষণ মৌতাতে থাকেন।
নাকফুলের অভ্যন্তরস্থ সুবাসের রহস্য উন্মোচন করতে অনেক সাবধানী ও সংযমী হতে হয়েছিল, কারণ নাকের নিচেই ঠোঁট। সেই ঠোঁটের অত কাছে যেয়ে, ঠোঁটকে ‘ধন্যবাদ’ না বলে ফেরত আসা অভব্যতা, আবার, ভব্যতা বজায় রেখে ধন্যবাদ দেওয়া যে কী পিচ্ছিল ও বন্ধুর! সে যাক।
এই এলোকেশি, সারাদিন ঘুমাতে পছন্দ করেন এবং পড়ন্ত-দুপুরে ঘুম থেকে উঠে গা-গোসল সেরে ঘড়ি দেখে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে ওঠেন, ‘ওহ, মাত্র দুইটা বাজে?’
কেন দিনে ঘুমান?
উত্তর, ‘দিনে ছারপোকারা কামড়ায় না!’ তাছাড়া, উনার অন্যতম প্রিয় খেলা হচ্ছে :‘ছারপোকার দৌড়’। কামড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন অবস্থায় হঠাত্ বেড-সুইচ টিপে আলো জ্বালালে, দেখবেন পড়ি কি মরি করে তানারা কেন্দ্র থেকে প্রান্তের দিকে পালাচ্ছেন। রাতভর এই centripetal & centrifugal দৌড়াদৌড়ি দেখে বেগম খুব মজা পান। সুইয়ের ডগায় বিভিন্ন রঙের নেল-পালিশ নিয়ে, তার ফোটা দিয়ে ইনি ছারপোকাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন চিহ্নিত করে, কে কবে জয়ী হচ্ছে তার ভিডিও-ডায়রি এবং এই জয়ের পেছনে, কার রক্ত অবদান রাখছে তার একটা খাতা সংরক্ষণ করেন। রেসের ঘোড়ার কথা শুনেই থাকবেন, প্রায় তেমনই।
ইনি ছারপোকা কোথায় পান?
তবে শুনুন। এ শহরের দক্ষিণাংশের রমনা এলাকার, নীলক্ষেত অংশে, শতবর্ষী এক প্রতিষ্ঠানে, সেই ইংরাজ আমল থেকেই ছারপোকারা স্ত্রীওনুক্রমে ঘরকন্না করে যাচ্ছে। এদেশের মাথা মাথা লোকদের প্রায় সব্বাই এ প্রতিষ্ঠানে একসময় শোয়া-বসা করেছেন, সুতরাং সব্বাই ‘পোকাদের সহবাসী, তাই এই ছার’দের নিধন করতে গেলেই ‘পোকারা বলে ওঠে :‘আমি রাজ্জাক ভাইয়ের রুমমেট ছিলাম’, ‘ছফা ভাইয়ের বইয়ের পাতার মার্কার হিসেবে কাজ করেছি’ এবং ‘হুমায়ুনের রাত্রিজাগা অধ্যবসায়ে আমাদের সঙ্গই কাজ দিয়েছে’। তাই, পোকাদের ঐতিহাসিক ভূমিকার মূল্যায়ন করে ‘বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী’ হিসেবে ছারপোকারা এখানে বিশেষ প্রাধিকারসম্পন্ন। এই অঞ্চলের ছাত্রী/ছাত্রাবাসসমূহ ছারপোকাদের level-playing-field, যেখানে ছারপোকা ও ধুরবোকা, দু পক্ষই, রিহ-রিহ ইচ্ছা নিয়ে ‘সেচ্চা’ অর্থাত্ see-saw খেলেন।
প্রসঙ্গত, এ এলাকায় আরেকটা প্রাণী আছে, যার নাম চাম-উকুন, যেটার কার্য আছে কিন্তু কারণ জানা হয় না, অস্তিত্ব আছে কিন্তু স্বীকার করা হয় না : স্বীকার করা ইজ্জত-কা-সাওয়াল! যেমন ভূত। অস্তিত্ব আছে কিন্তু স্বীকার করা হয় না! আরে ভাই, ভূত যদি না-ই থাকবে তাহলে ‘ভূতের গলি’ হলো কীভাবে? পাতলা খান নামীয় কেউ না থাকলে কি পাতলা খান লেন নাম হতে পারত? খান, চৌধুরী, সৈয়দ, খন্দকার, বামপন্থি, দক্ষিণপন্থি, ছাত্র, ছাত্রী, অছাত্র, অছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, গলাজীবী, কারো প্রতি বিন্দুমাত্র তমিজ নেই এই চাম-উকুনের। নির্বিশেষ চড়ে বেড়াচ্ছে এবং স্থানে-অস্থানে, সময়ে-অসময়ে ‘কুটুস’ মেরে দিচ্ছে। খয়েরি রঙের ‘তিল-আকৃতি’ এই প্রাণীটি, বিশেষ করে শরীরের রোমশ অংশে এভাবে লেপ্টে থাকে যে, চাঁছা-চাঁছিতে সংখ্যা কমানো যায়, কিন্তু নির্বংশ হয় না। নির্মূল করতে হলে, প্রথমে চাঁছার পর দ্বিতীয় ধাপে নখ দিয়ে চিমটে চিমটে তুলে—হয় টুশ্ টুশ্ করে ফোটাতে হয়, নয় খুব নিকটস্থ-বন্ধুর বিছানায় ছেড়ে দিয়ে :‘নে, এবার নাকে তেল দিয়ে ঘুমা’। এই দ্বিতীয় ধাপের প্রথম বিকল্পের কাজটি এক ‘লাল ভাই’, বানর দিয়ে সেরেছিলেন, কারণ বানররা উকুন বাছায় ওস্তাদ, তাছাড়া, ‘লাল ভাই’রা বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী, তাই বানর-বান্ধব! তবে সেই বানর একপর্যায়ে তাকে বেশ হেনস্থা করেছিল। ভাইয়া, নাঙ্গা-সন্ন্যাসীর মতো সমাধিস্থ-ধ্যানে দু হাত মাথার ওপর দিয়ে চিত্ হয়ে শুয়ে আছেন, আর বানর দাদা তার বাহুমূল থেকে টপাটপ তুলে খাচ্ছেন, কিন্তু গোল বাধলো, শরীরের মধ্য-নিম্নাংশে। দাদা যতই ‘ওটা’ নেড়ে-চেড়ে তলার গলি-ঘুপচিতে পৌঁছাতে চান, লাল ভাই ততই স্পর্শকাতর হয়ে, মুচড়া-মুচড়ি শুরু করেন, অবশ্য এই মুচড়া-মুচড়িতে ওটা কিঞ্চিত্ সতেজ হবার কারণে, লেপ্টে থাকা সমস্ত উকুন বেছে ফেলা অনেক সহজ হয়েছিল। বানর দাদা সেগুলোকে সটান চেটেপুটে উদরস্থ করার প্রক্রিয়ায় ভাইয়ার কাতরতা আরো বাড়ছিল। দু-একবার এমন কাতরানির পর, বিরক্ত হয়ে সেই দাদাঠাকুর ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে ভাইয়াকে পাথরের মতো স্থবির করে, বাকিগুলোকে সাবাড় করেন। সবশেষে আমরা জিজ্ঞেস করলাম :‘চড় কেমন লাগল?’ তার উত্তর :‘ব্যাপ্তি কম, কিন্তু অনেক গভীর!’ বাচ্চাদের আঙুল ও চেটোর মতো, বানরের আঙুলও খুব চিকন, পাতলা, হাতের চেটোও বেশ ছোট, কিন্তু যখন চড় দাগায়, সেটা সপাং করে লাগে ও জ্বলে। তাই ব্যাপ্তি কম, কিন্তু গভীর!
ভিন্নার্থে, কম ব্যাপ্ত ও বেশ গভীর, এই রমনা এলাকাতেই এলাচি বিবির থান।
ইনার কাছ থেকে রাতের গপ্পো শুনে মুচড়ে উঠতে হয়, কারণ ইনি নাকি গভীর রাতে অপরাজেয় বাংলার তিনজনকে হেঁটে হেঁটে পলাশীর দিকে যেতে দেখেছেন। একদিন সাহস সঞ্চয় করে উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন। সেই ত্রয়ী নাকি তত্ক্ষণাত্ তাদের গুলি, বন্দুক, ব্যাগ উনার কাছে জমা রেখে বলেছেন :‘পলাশী থেকে একটু চা খেয়ে আসি, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ধরে গেছে।’ চা সেরে ফিরে এসে বটতলায় বসে অনেক কথা হয়েছে। প্যান্ট পরা ফরহাদ, কাছামারা মকবুল আর শাড়ি জোবেদা। সমস্ত গপ্পো এলাচির কাছ থেকে শুনে নেবেন, তবে সুবেহ সাদেকের পূর্বমুহূর্তে যখন গল্পাসর শেষ হয়, তখন মকবুল তার বেল্ট থেকে একটা গুলি, এলাচিকে ‘forget me not’ হিসেবে দেন, আর এলাচিও এক দানা, forget me if you can হাঁকিয়ে মকবুলের গুলির খাঁজে রেখে দেন। বিশ্বাস না হলে, বেল্টে গুলির সংখ্যা গুণে দেখুন।
বগুড়া থেকে নওগাঁ যতদূর তারচেয়ে দূরত্ব অনেক কম—এলাচি বেগম ও ছোটকল্কির মাঝে। বেগমের গেঁজো ব্যাগের ভেতরে যা যা থাকে তা হচ্ছে :গোলাপ জল, নারকেলের ছোবড়া, দেড় ইঞ্চি বনাম তিন ইঞ্চি মাপের আয়তকার এক টুকরা কাঠ, ম্যাচ, অর্ধেক রুমাল আকৃতির মার্কিন কাপড়, Cone আকৃতির খুব ছোট একটা পোড়া মাটির টুকরা, কিছু সাদা পাতা, ইত্যাদি।
পাতাগুলোর মধ্যেখানের লম্বা শক্ত ডাঁটিগুলোকে (leafstalk) বাদ দিয়ে শুধু পাতা (blade) নিয়ে, একইভাবে সাদা পাতার অর্ধেকটা নিয়ে, দু-এক ফোঁটা গোলাপজল ছিটিয়ে হাতের তালুতে দলাই-মলাই করার একপর্যায়ে, আয়তকার কাঠের টুকরার ওপর ফেলে কাটনি দিয়ে কাটেন—তামাকের সুকা’র (flake) মতো মিহি ও পাতলা। আরেক সাঙ্গাতকে লাগিয়েছেন, নারকেলের ছোবড়া দুরস্ত করার জন্য—চিকন কিন্তু শক্ত আঁশগুলোকে নিয়ে আস্তে আস্তে একটা পুটুলির মতো করে গোল গোল কতগুলো দলা তৈরি হয়, যেগুলো মার্বেলের চেয়ে বড়—অনেকটা ডালপুরি বানানোর পূর্বে যে পুটুলি হয়—সে আকৃতির। অন্য সাঙ্গাত, খবরের কাগজের পাতাগুলোকে দু ইঞ্চি চওড়া লম্বা লম্বা করে ছিঁড়ে এক জায়গায় সাজিয়ে রাখছেন।
এলা-র সাঙ্গাতদের মধ্যে দুজন চারুশিল্পী। এক সন্ধ্যার আসরে, এই দুজনের একজন, কিঞ্চিত্ ঝিম ধরে কুইজ ঝারল :‘আচ্ছা, ধরা যাক, চীন ও ভারত দুটোই সাপ। এখন এই সাপ দুটো যদি পরস্পরকে লেজের দিক থেকে গিলতে থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত কী হবে?’ অন্যজন, মাটিতে অনেকক্ষণ গোল গোল আঁকিবুঁকি করে, হঠাত্ ঠা ঠা করে হাসে আর হাততালি দিয়ে গায়—‘আইট্কা গে-ছে, আ-ই-ট্-কা গে-ছে’। অনেকটা কুকুরকে হাগু করতে দেখলে কনিষ্ঠাদ্বয়ের আংটা বানানোর পর, হাগু আটকে গেলে, যে ঠা ঠা আসে, তেমনই। এই গাঁজেনদের হাসি শুনে, আসরের অন্য গাঁজেনরা পুরা ‘বেওয়াকিফ’ অতঃপর ‘ওয়াকিফ’ হয়ে, তারাও হাসিতে সামিল হবার পর্যায়ে, লাচি বিবির দার্শনিক উক্তি : ‘আইট্কা গেছে সব হালা-ই’।
‘এই লিগ্যাই’, এলা নীলক্ষেতকে খুব ‘ভালো পায়’। তার ভাষায়, এটা ‘নাবালকের চারণভূমি’। কম বুদ্ধি ও বেশি বোধ নিয়ে এখানেই টেকা যায়। ‘বোধ’ কবিতাটি বেগমের খু-উ-ব পছন্দ। তাই একইসঙ্গে বোধে শান দিয়ে আর বুদ্ধির ছড় টেনে ‘অন্তর্দীপ্ত’ থাকার জন্য, তিনি নীলক্ষেতে দান ফেলেছেন। ইচ্ছা আছে, মাইক্রোবাস কঙ্কালের প্রায় পাশেই যে ঝুপড়ি ঘর, সেখানেই বাকি জীবন দম নিবেন ও দম দিবেন।
মকবুল তো দাঁড়িয়ে আছেই!
