কেএনএফ প্রধান নাথান বমের বাড়ি এখন পরিত্যক্ত, ভূতুড়ে

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০২:২১

পাহাড়ের রূপ সৌন্দর্যের নীলাভূমি বান্দরবান। জেলা শহর থেকে পাহাড়ি পথে রুমা থানা শহরের দূরত্ব ৪৩ কিলোমিটার। এই ৪৩ কিলোমিটার পথ পুরাটাই পাহাড়ি পথ। পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢাল বেয়ে সরু রাস্তা ধরে যেতে হয়। রাস্তার দুই পাশের দাঁড়িয়ে আছে উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঘন জঙ্গল। বর্ষায় জঙ্গলের গাছপালা আরও সবুজ হয়ে  গেছে। যেদিক চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য্য গোটা বান্দরবানেই। সবুজের এই লীলাভূমিতে গত তিন বছর ধরে চলছে অস্থিরতা।

পাহাড়ের পাদদেশে ছিমছাম পরিবেশে রুমা বাজার দেশের পর্যটকদের রাত যাপনের জন্য একটি সুপরিচিত স্থান। সর্বোচ্চ পাহাড় তাজিংডং কিম্বা কেওকারাডং অথবা পাহাড়ের ওপর বগালেক দর্শন করতে হলে সবাইকে রুমা বাজার দিয়ে যেতে হয়। রুমা বাজারের আশেপাশে বেশ কয়েকটি বোম পরিবার অধ্যুষিত পাড়া রয়েছে। এর মধ্যে একটি পাড়ার নাম ইডেন পাড়া। বান্দরবানে বম জনগোষ্ঠীদের নিয়ে গঠিত কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথান বমের বাড়ি ইডেন পাড়া। 

রুমা বাজার প্রবেশ করার পর টুরিষ্টদের এন্ট্রি পয়েন্টের সামনে বাম দিকে বাজারের ভিতরে একটি সরু রাস্তা চলে গিয়েছে। রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে গেলে বাজারের পেছনের দিকে পৌছার পর ডান দিকে আরেকটি রাস্তা চলে গিয়েছে। এই রাস্তা ধরে ১শ মিটার এগিয়ে যাওয়ার পর রাস্তাটি ধীরে ধীরে উঁচু বেড়ে যাচ্ছে। রাস্তা সংলগ্ন টিন দিয়ে ঘেরা একটি বাড়ি দেখা যায়। বাহির থেকে দেখলে মনে হবে অত্যন্ত সাজানো গোছানো একটি খাড়া টিনশেডের একটি বাড়ি, নান্দনিক দর্শন। বাড়িতে প্রবেশের জন্য টিনের দেয়ালে দুই পাল্লার টিনের দরজাটি বাহির থেকে বন্ধ করে দেয়া। এটাই নাথান বমের পৈত্রিক বাড়ি। 
বাড়ির দরজা খুলতেই উঠান দেখা গেলো। ছোট্ট একটা উঠান। এখানে সেখানে ভাঙ্গা ইটের টুকরা, কোথাও আস্ত ইটের স্তূপ পড়ে আছে। তাতে শ্যাওলা হয়েছে। উঠান পেরোতেই টিনের বারান্দা। বারান্দার দুই দিক কাঠ দিয়ে সুন্দর হাঁটু অবধি দেয়াল। বারান্দার টিন ভেদ করে ৪০/৫০ বছরের পুরাতন একটি কাঁঠাল গাছ আকাশে উঁকি দিচ্ছে। বারান্দার ডানপার্শ্বের সামনে ৩ ফুট উঁচু বেদিতে একটি মানুষের ভাস্কর্য দেখা যায়। ভাস্কর্যটিও শ্যাওলায় ভরে গেছে। কেমন জানি একটা ঘুটঘুটে ভাব। বারান্দা পেরিয়ে বাসার প্রবেশ দরজায় ঠেলা দিতেই খুলে গেল। ভিতরে অন্ধকার। মোবাইল ফোনের লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে দেখা গেল ওই রুমটি ড্রইং রুম। মেঝেতে বিভিন্ন জিনিসপত্রের ভাঙাচোরা অংশ পড়ে আছে। ড্রইং রুমের এক কোনায় কাঠের গুড়িতে খোদিত এক নারীর আবক্ষ ভাস্কর্য রাখা আছে। দেয়ালের ওপরে ৬/৭ টি আঁকা দেয়াল চিত্র টানানো আছে। কাঠের টেবিল, বুক সেলফ, সোফাসেটসহ সবই তছনছ করা হয়েছে। বুক সেলফ ঘেঁটে সেখান থেকে বম জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বই পাওয়া গেল। পাশেই একটি লেমিনেটিং করা জন্ম নিবন্ধন সনদ পড়েছিল। সেটিতে লেখা রয়েছে লাল সমকিম বম। জন্ম তারিখ ১৯৮১ সালের ৩০ নভেম্বর। ঠিকানা-পাইজল পাড়া, রেমাক্রি, থানা-থানচি। লাল সমকিম বম নাথান বমের স্ত্রী। তিনি পেশায় একজন নার্স। ২০২৪ সালে তিনি রুমা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন। পরে কেএনএফের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালানোর পর লাল সমকিম বমকে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে বদলি করা হয়। তবে ওই ঘটনার পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। 

ড্রইং রুমের মেঝেতে মোবাইল ফোনের আলো দিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষার একটি প্রবেশপত্র পাওয়া গেল। সেটিতে লেখা রয়েছে নাথান লনচেও, জগন্নাথ হল, শিক্ষাবর্ষ-৯৫-৯৬, পরীক্ষা-১৯৯৯। এটি কেএনএফের প্রধান নাথান বমের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষার প্রবেশপত্র। 
ড্রইং রুমের পরই রান্নাঘর। রান্নাঘরের হাড়ি, পাতিল ও অন্যান্য জিনিসপত্র সবই তছনছ করা। মেঝেতে পড়ে আছে প্লেট, গ্লাস, ছাকনি, তেলের বোতল ইত্যাদি। পাশের রুমটি বেডরুম। এই ঘরের সব জিনিসপত্র তছনছ করা। বিছানার চাদর ও বালিশে ধুলার আস্তর জমে গেছে। পুরা বাড়িতে এক ধরনের ভূতুড়ে পরিবেশ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিপরীত পাশে একটি নির্মাণাধীন তিন তলা বাড়ি দেখা গেল। কেউ কেউ বললেন, ৪/৫ বছর আগে নাথান বম এই বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ২/৩ বছর আগে তিনি আত্মগোপনে যাওয়ার পর বাড়ির নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। 

তবে এই বাড়িটি আসলে একটি গির্জার নির্মাণ কাজ চলছিল। গির্জায় ওঠার রাস্তার মুখে উঁচু বেদিতে এক ব্যক্তির ভাস্কর্য দেখা গেল। ভাস্কর্যের গায়ে ইংরেজিতে রেভারেন্ড এডউইন রোলেন্স নাম খোচিত। ভাস্কর্যের আরেক পৃষ্ঠে লেখা রয়েছে, বোমরাম গসপেল সেনটেনারি (১৯১৮-২০১৮), ‘মিকিপ তা দিয়াং থাওয়াংথাং থা’, ফুনতুঃ গসপেল সেনটেনারি রুমা খুয়া, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮। আশেপাশের লোকজন জানালেন, এটি ভারতের মিজোরাম কেন্দ্রিক বমদের খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে মনুমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ইউটিউব ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর রুমা বাজারের ইডেন পাড়ায় এই বাড়ির সামনে বম জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে। সেখানে বান্দরবানের বোম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মিজোরাম থেকে কয়েকশ বম জনগোষ্ঠী অংশ নেন।

তারা আরও জানায়, বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় রেভারেন্ড এডউইন রোলেন্স নামে একজন খ্রিষ্ট ধর্মযাজক ১৯১৮ সাল থেকে বোমরা খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকেন। সেটিকে স্মরণ করে রাখার জন্য নাথান বোমের বাড়ির পাশে নির্মাণাধীন গির্জার সামনে রেভারেন্ড এডউইন রোলেন্সের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এই গির্জাটি টিলা টাইপের উঁচু স্থানে তিন তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে আশেপাশের লোকজন জানালেন, এটির নির্মাণ কাজ তিন বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। পাশেই নাথান বোমের বাবা ও মায়ের মনুমেন্ট করা হয়েছে। বাবার ভাস্কর্যে জুয়ান লনচিউ (১৯২০-২০১৫) এবং মায়ের ভাস্কর্যে রকিল (১৯৩০-২০১৬) নাম খোদাই করা।

নাথান বমের বাড়ির পাশে বসবাস করেন গ্লোরী বম। দুই মেয়ের জননী তিনি। বড় মেয়ের বয়স ৪ বছর। ছোট মেয়ের বয়স দুই বছর। তার সঙ্গে যখন এই প্রতিবেদক কথা বলছিল, তখন তার কোলে দুই বছরের মেয়ে যার নাম জিমহিম পাড়। নাথান বমকে দেখেছেন কি না জানতে চাইলে গ্লোরী বলেন, ‘আমার বিয়ের পর এই বাড়িতে আসি। তখন আমি নাথান বমকে দেখিনি। তবে তার স্ত্রী সমকিম বমকে দেখেছি। ওই টিনের বাড়িতেই তিনি থাকতেন। গত বছরের এপ্রিল মাসের পর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। ওই বাড়িটিও বন্ধ।’

ইত্তেফাক/এমএএম