ভূগর্ভস্থ পানির স্তর লইয়া পরিবেশবিদ, ভূতাত্ত্বিক, সচেতন নাগরিক এমনকি সরকারও চিন্তিত। এখন ইহা সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশের মাটির নিচে, অর্থাত্ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশই নিচের দিকে নামিয়া যাইতেছে। সরকারি হিসাবমতে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পানির স্তর ৪ হইতে ১০ মিটার পর্যন্ত নামিয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া ঢাকা মহনগরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর লইয়া দুশ্চিন্তা দিনে দিনে বাড়িতেছেই। এই কারণে সরকার মাটির উপরিভাগের পানিকে বিশুদ্ধ পানি হিসাবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে কয়েক বত্সর আগেই। সেই অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ভূগর্ভস্থ পানির উেসর উপর চাপ কমাইয়া ভূ-উপরিস্থ পানির উেস জোর দেওয়ার কথা ঢাকা ওয়াসার। কিন্তু পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, প্রতিষ্ঠানটি বরং ভূগর্ভস্থ উেসর উপর আরো নির্ভরশীল হইয়া পড়িতেছে। ক্রমেই বাড়িতেছে ওয়াসার গভীর নলকূপের সংখ্যা। গত বত্সর ওয়াসার গভীর নলকূপের পাম্পের সংখ্যা ছিল ৮৫৫টি। বর্তমানে এই সংখ্যা বাড়িয়া হইয়াছে ৯২৮টি। উল্লেখ্য, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা পাঁচটি পানি শোধনাগারের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ উত্স হইতে পানি সংগ্রহ করিয়া রাজধানীবাসীকে ৪৯ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করিতেছে। অথচ ঢাকা মহানগরে পানির চাহিদা রহিয়াছে ২২৫ কোটি লিটার। ওয়াসা যথার্থই বলিয়াছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে নলকূপ স্থাপন করিতে হইতেছে। কিন্তু কথা হইল, এইভাবে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িলে এবং গভীর নলকূপ বৃদ্ধি করা হইলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা কমানোর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে।
উপরিভাগের পানি ব্যবহারে সরকারের একটি বড়ো সুবিধা হইল ঢাকার সঙ্গেই লাগোয়া তিনটি বড়ো নদী রহিয়াছে। ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করার এইরকম সুবিধা বিশ্বের বহু বড়ো শহরের নাই। এই সুবিধাটি যত দ্রুত সম্ভব কাজে লাগাইতে হইবে। প্রতিদিনই পানির চাহিদা বাড়িতেছে। যত বিলম্ব হইবে ততই গভীর নলকূপের উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়া যাইবে। সেইসঙ্গে ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যবহারোপযোগী পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা জানি, ঢাকার আশপাশের নদী-খালগুলি দূষিত হইতে হইতে বিষাক্ত হইয়া পড়িয়াছে। অবস্থা এতই করুণ যে, ইহা যথাযথভাবে শোধন করাও কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। ভূ-উপরিস্থ এই দূষিত পানি যেই সকল প্ল্যান্টে ট্রিটমেন্ট করা হয়, সেইগুলিতে ব্যাকটেরিয়া থাকিয়া যায়। সেই জন্য ডিজইনফেকশন ব্যবস্থার মাধ্যমে মাইক্রো অরগানিজমগুলিকে মারিয়া ফেলিতে হইবে। তাহা না হইলে পানি সরবরাহ করিয়াও বিশেষ লাভ হইবে না। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারেও কিছু প্রতিবন্ধকতা রহিয়াছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে কোথাও কোথাও আর্সেনিক থাকে এবং কোথাও লোহার উচ্চহার এবং ম্যাঙ্গানিজ পরিলক্ষিত হয়, যাহা পানির স্বাভাবিক গুণ নষ্ট করিয়া থাকে। এইসব কারণেও আমাদের যত দ্রুত সম্ভব ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারে অভ্যস্ত হইয়া উঠা প্রয়োজন।
