বিভিন্ন প্রকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার জন্য বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এখন বিপুল সম্ভাবনাময় এক জনপদ। বিশেষত পদ্মা সেতু ও পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ শেষ হইলে এতদঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে উন্মোচিত হইবে এক নূতন দিগন্ত। ইহার জন্য সরকার, এখানকার শিল্পোদ্যোক্তা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ কতটা প্রস্তুত এই প্রশ্ন স্বাভাবিক কারণেই আসিয়া যায়। এক বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর দৈন্যদশার উদাহরণ দিয়া বলা যায়, তাহারা আসলে এখনো জাগিয়া উঠে নাই। ১৯৬০-৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হইলেও দেশের সর্ববৃহত্ আয়তনের এই বিসিক শিল্প এলাকাটির বিকশিত হয় নাই। প্রতিষ্ঠার পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পার হইয়া গিয়াছে, অথচ এখনো ইহার অধিকাংশ প্লটই অব্যবহূত। মোট ৪৪৬টি প্লটের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে ৩৭৮টি প্লট। তন্মধ্যে শিল্প-কারখানা গড়িয়া তোলা হইয়াছে মাত্র ১৭৩টিতে। আর বর্তমানে চালু আছে মাত্র ৫০টি কারখানা। আরো শুভংকরের ফাঁকি হইল—সেখানে আসলে চার হইতে পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সক্রিয়, বাকিগুলি বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তার বিশাল বিশাল গোডাউন বই কিছু নহে।
প্রকৃতপক্ষে বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর সমস্যার তালিকাটি দীর্ঘ। প্রথমত বিদ্যুত্সংকটের কথা না বলিলেই নহে। একটি শিল্পনগরীর জন্য যে জ্বালানি চাহিদা থাকে, তাহা ঠিকমতো মিটানো না হইলে উদ্যোক্তারা যে সেই নগরীর প্রতি আকৃষ্ট হইবেন না তাহা বলাই বাহুল্য। এইখানে বিদ্যুতের একটি পৃথক ফিডার বা সাবস্টেশন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, এইখানকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই শোচনীয়। পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য কোনো গাড়ি তাহার ফ্যাক্টরি অবধি আসিতে পারিলেও পণ্য নিয়া আর সহজে যাইতে পারে না। সড়কের খানা-খন্দে আটকাইয়া থাকে পণ্য বোঝাই গাড়ি। ইহাতে পণ্য উত্পাদন ব্যাহত হইতেছে মারাত্মকভাবে। এইখানকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ফলে জলাবদ্ধতা বা কর্দমাক্ততা যেন এখানকার নিয়তি। তৃতীয়ত এখানে নিরাপত্তার অভাব প্রকট। এতদিনেও নিয়োগ দেওয়া হয় নাই নৈশপ্রহরী, নির্মিত হয় নাই প্রাচীর। এই কারণে অব্যবহূত প্লটগুলি মাদকসেবীদের অভয়ারণ্য ও গোচারণভূমিতে পরিণত হইয়াছে। এই শিল্পনগরীর প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরাইয়া আনিতে হইলে এইসব অযত্ন ও অবহেলা দূর করা প্রয়োজন।
দুই বত্সর আগে ২০১৭ সালের ৭ জুলাই প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে আমরা লিখিয়াছিলাম যে, বরিশাল বিসিকের উন্নয়নের জন্য একনেকে যে ৫২ দশমিক ২০ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হইয়াছে, সেই ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয় যেন অচিরেই চিঠি ইস্যু করে। ইতোমধ্যে সেই অর্থ আসিলেও প্রশাসনিক অদক্ষতায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হয় নাই। এখন ইহার তৃতীয় দফা মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য দেন-দরবার চলিতেছে। অবাক হইতে হয়, আমরা প্রায়ই দেখি প্রকল্পের টাকা ছাড়ে বিলম্ব হয়, আবার প্রকল্প বাস্তবায়নেও কালক্ষেপণ করা হয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই প্রশাসনের উপর আমরা কীভাবে ভরসা রাখিতে পারি? অতএব, বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হউক। এই শিল্পনগরীকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ইহার অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, উদ্যোক্তাদের ঋণসুবিধা, শিল্প ইউনিট স্থাপন, উত্পাদন ও বিপণনসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা অবিলম্বে নিশ্চিত করা হউক।
