দেখা ও শোনায় যতটা পার্থক্য, সম্ভবত পরিসংখ্যান ও বাস্তবতায় ফারাক ততটাই। অনেকটা কাজির গরু কিতাবে থাকার মতো, যদিও বাস্তবে গোয়াল শূন্য। পরিসংখ্যাননির্ভর অর্থনৈতিক উল্লম্ফনসহ সার্বিক যে উন্নয়নের চিত্র প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়, তার ফাঁকফোকর ক্ষেত্রবিশেষে উপেক্ষা করা যায় বটে; তবে অনেক ক্ষেত্রেই ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড়ো আকারের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড়িয়ে যায়। যেমন মাথাপিছু আয়।
বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১ লাখ ৬০ হাজার ৬০ টাকা। এই হিসাবে প্রত্যেকের দৈনিক আয় ৪৩৮ টাকা হওয়ার কথা, অথচ কৃষিশ্রমিকের গড় মজুরি ৩৮৬ টাকা। প্রথমবারের মতো করা বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসএস) কৃষি ও পল্লি পরিসংখ্যান প্রতিবেদন বলছে, রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে দিনমান ঘাম ঝরিয়ে দেশের সাড়ে ৭৭ লাখ কৃষিশ্রমিক মাথাপিছু হিসাবের চেয়ে দৈনিক ৫২ টাকা কম রোজগার করেন। এর মধ্যে নারী কৃষিশ্রমিকের আয় পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় গড়ে আরও ৪২ টাকা কম।
এই পটভূমিতে সিপিডির ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-২০১৮, প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’য় এক ঝলক নজর দেওয়া যেতে পারে। গবেষণা প্রতিবেদনটি বলছে, দেশে গত ছয় বছরে জিডিপি বৃদ্ধির দিনগুলোয় সবচেয়ে ধনী ৫ ভাগ মানুষের আয় বেড়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা, আর সবচেয়ে গরিব ৫ ভাগ মানুষের আয় কমেছে ১ হাজার ৫৮ টাকা করে। অর্থাত্, মাথাপিছু আয়ের হিসাবের কোথাও না কোথাও বড়ো ধরনের একটা গরমিলের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
একজন ব্যবসায়ীর হাতে যদি থাকে ১৫০ টাকা, কৃষিশ্রমিকের ২০ টাকা আর পোশাকশ্রমিকের পকেটে ১০ টাকা; পরিসংখ্যান বলবে, এই তিনজন গড়ে ৬০ টাকার মালিক। এখানে আরেক পক্ষ ভিখারিকে যদি যুক্ত করা হয় এবং ধরে নেওয়া হয় তার হাত খালি, পরিসংখ্যানের চমত্কারিত্ব তখন আরও পরস্ফুিটিত! সে ক্ষেত্রে এই চারজনের প্রত্যেকে গড়ে ৪৫ টাকার মালিকানা ভোগ করবে। ফুটো পয়সা না থাকলেও ভিখারি অর্থবান, আর অঢেল সম্পদের মালিক হলেও শীর্ষ ব্যবসায়ী ‘আমজনতা’! উন্নয়নশীল দেশের তিন মাপকাঠির অন্যতম মাথাপিছু আয় নিয়ে তাই উচ্ছ্বসিত হওয়ার পাশাপাশি দরকার নির্মোহ বিশ্লেষণ।
ভারতে যখন নাকি জিডিপি ৮ শতাংশের বেশি, তখনো বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের তালিকায় দেশটি শীর্ষে। দারিদ্র্যসীমার নিচে প্রায় ৮০ কোটি ভারতীয়, অপুষ্টির শিকার ১৯ কোটি মানুষ, আর হররোজ আত্মহত্যা করে ‘মুক্তি’ খুঁজে নিচ্ছেন ৪১ জন কৃষক। সুতরাং, উন্নয়নশীল দেশের বাকি দুই মাপকাঠি—মানবসম্পদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি হ্রাসসহ মাথাপিছু আয়ের কাগজে-কলমে হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব ঘোচানোই বড়ো চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের প্রথম পাঁচ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনের অন্যতম নিয়ামক কৃষি (বাম্পার ক্রপ হারভেস্ট)। বাকি খাতগুলো হলো ম্যানুফ্যাকচারিং (যেমন গার্মেন্টস), অবকাঠামো নির্মাণ ও রেমিট্যান্স।
এই উন্নয়নশীল বাংলাদেশের ‘প্রাণ’ কৃষিতে জড়িত অধিকাংশ মানুষের পরিস্থিতি যে এখনো ‘উন্নয়নশীল’ নয়, সে কথাটিই আরেকবার মনে করিয়ে দিল বিএসএসের গবেষণা। এতে বলা হচ্ছে, পল্লি এলাকায় কৃষি খাতে জড়িত ২ কোটি ৪৩ লাখ মানুষ। এর এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক (সাড়ে ৭৭ লাখ), আর ৮১ লাখ মানুষ নিজের জমিতে চাষাবাদ করেন। বাকি দেড় লাখের মতো মানুষ নানাভাবে কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট কাজকর্ম করেন। কিন্তু কারোর অবস্থাই সুবিধার নয়, যতটা সুবিধায় অর্থনীতি।
পরপর কয়েক বছরের বাম্পার ফলনে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেয়েছে দেশ। এই তথ্য বিশ্বব্যাংকের বরাতে পেয়ে তৃপ্তির বুলন্দ ঢেঁকুর তোলা হয় বটে, তবে একবার কৃষির দিকে ঠিকঠাক নজর দিলে মনটা চুপসে যাওয়ার কথা। ফসলের ন্যায্য দাম পান না কৃষক। উপরন্তু এক টন ধান বেচতে ঘুষ দিতে হয় তিন হাজার টাকা। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও সঠিক পারিশ্রমিক পান না কৃষিশ্রমিক। আছে বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মার। তবু জিডিপিতে কৃষির হিস্যা ১৪ শতাংশ—পরিসংখ্যানের এটুকুও মনে রাখতে বলি।
n লেখক :সাংবাদিক
