তিন জেলায় বন্যার অবনতি

জামালপুরে নৌকা ডুবে পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৬

বন্যার্তরা যখন ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখন আবারও বাড়তে শুরু করেছে যমুনা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি। এতে জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় বন্যাকবলিত লাখ লাখ মানুষের স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেল। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে তারা ফিরতে পারছে না বাড়িঘরে। বন্যাকবলিত এসব এলাকার কয়েক লাখ মানুষ এখনো সড়ক, বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। ভারী বৃষ্টিপাত, নদীর পানি বৃদ্ধিতে বানভাসিদের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিত্সাসেবা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তবে ত্রাণের অপ্রতুলতা, বিশুদ্ধ পানির অভাব, গোখাদ্যের সংকটে বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলার বন্যার্তরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বেড়েছে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। এদিকে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে নৌকা ডুবে দুই বোনসহ পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। ইত্তেফাকের আঞ্চলিক অফিস, জেলা প্রতিনিধি ও উপজেলা সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

যমুনা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি :গতকাল বেলা ৩টার দিকে যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে পানি ১৩৪ সেন্টিমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫১ সেন্টিমিটার বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টায় কুড়িগ্রামে ধরলার পানি ৩৩ সেন্টিমিটার বেড়ে ৭৩, যা বিকাল ৬টার দিকে ৭৬ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের ৪৩ সেন্টিমিটার, গাইবান্ধায় ঘাঘট ও  ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে বিপত্সীমার যথাক্রমে ২৫ ও ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত দেশের প্রধান নদ-নদীর ১৯টি পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও এর মধ্যে ৬টি পয়েন্টে পানি কমেছে।

৩ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি :ভারী বৃষ্টি আর যমুনা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জামালপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে বন্যার অবনতি হয়েছে। ফলে বন্যাকবলিত যেসব এলাকা থেকে পানি নেমে গিয়েছিল, সেসব এলাকাসহ নতুন নতুন এলাকায় আবারও পানি ঢুকতে শুরু করেছে। গাইবান্ধা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি পুনরায় জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ঘাঘট নদীর শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে ছয়টি এলাকায় নতুন করে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যায় এ জেলায় ২৪২ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩৭টি পয়েন্টে ধসে গেছে। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধে ১৪টি পয়েন্টে, ঘাঘটের শহররক্ষা বাঁধের ছয়টি পয়েন্টে, করতোয়ার তিনটি পয়েন্টে ও আলাইসহ অন্যান্য নদীর ১৪টি পয়েন্টে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৯৯ কিলোমিটার বাঁধ। সফর করে এ জেলাকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন বাম জোটের কেন্দ্রীয় নেতারা। কুড়িগ্রামে নতুন করে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট। বন্যার পানি ঘরবাড়ি থেকে নামতে-না নামতেই আবারও পানি বৃদ্ধি আতঙ্কিত করে তুলেছে জেলার সাড়ে ৯ লাখ বানভাসি মানুষকে। গতকাল চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা শহরে আবারও পানি ঢুকতে শুরু করায় দুর্ভোগ আরো চরম আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে বাঁধ, রেললাইন, উঁচু সড়কসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবাদি পশুসহ আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তদের ঘরে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নতুন করে বন্যায় গতকাল জামালপুরের ইসলামপুরে মোশাররফগঞ্জ-দেওয়ানগঞ্জ রেল রুটে দীঘলকান্দি ৩১ নম্বর রেল ব্রিজ-সংলগ্ন রেললাইনের প্রায় ৫০ মিটার মাটি ধসে রেললাইন অকেজো হয়ে পড়ায় ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জের মধ্যে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সূত্র জানায়, জেলার সাতটি উপজেলার ৬৮ ইউনিয়নের মধ্যে ৬২টি ইউনিয়ন, ৮টি পৌরসভার মধ্যে ৭টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। এ পর্যন্ত এ জেলায় প্রায় ১৩ লাখ লোক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যমুনার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের সিরাজগঞ্জে বন্যার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কাজীপুর, চৌহালীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ ভাঙা অব্যাহত রয়েছে।

নৌকা ডুবে দুই বোনসহ পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু : জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় নৌকাডুবিতে দুই বোনসহ পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল উপজেলার আওনা ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামে মৌলভীর বাজারসংলগ্ন নিকাই বিলে এ ঘটনা ঘটে। তারা বিলের পানিতে নৌকা নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিল। এরা হলো আওনা ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের খবিরুল ইসলামের মেয়ে ও স্থানীয় অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সুবর্ণা আক্তার (১৮) ও তার বোন পঞ্চাশী কেএলপি প্রিক্যাডেট স্কুলের ছাত্রী ঝুমা আক্তার (৮), একই গ্রামের গোলাম মোস্তফার মেয়ে স্থানীয় পঞ্চাশী রেজাউল করিম দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী অন্তরা আক্তার (১২), পঞ্চাশী গ্রামের রিপন শিকদারের মেয়ে ধনবাড়ীর শাপলা কিন্ডার গার্টেনের ছাত্রী রুদশী আক্তার (৭) ও টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার পাইসকা গ্রামের জবানুর রহমানের মেয়ে পঞ্চাশী কেএলপি প্রিক্যাডেট স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল জয়া (১০)। জান্নাতুল ও রুদশী সম্পর্কে খালাতো বোন।

উত্তরাঞ্চলে ঈদের আগে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ার আশঙ্কা, বন্যায় বিপর্যস্ত রেললাইন :উত্তরাঞ্চলে প্রবল বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রেলযোগাযোগ। বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি রুটের ট্রেন চলাচল। বন্যায় রেলওয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এতে বলা হয়েছে, সাতটি রুট বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ের বেনারপাড়া-বাদিয়াখালী সেকশনে রেললাইনের ওপর দিয়ে এখনো বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিভাগীয়ভাবে ছোটো ছোটো স্পটে মেরামতকাজ শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরোপুরি কাজ শেষ করতে আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এদিকে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হতে পারে আগামী ১০ অথবা ১১ আগস্ট। ফলে এই রুটে ঈদের আগে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার শহীদুল ইসলাম বলেন,  গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।