সরকার পরিবর্তন হলেও ভাগ্য বদলায় না হোজির নদীর 

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫, ১৫:৪৩

বাগেরহাট জেলা শহর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হোজির নদী একসময় চলাচল করতো নৌযান, স্থানীয়রা মাছ শিকার ও কৃষি সেচের ভরসা ছিল এই নদী। তবে বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে থাকা নদীটি মাছের খামারে রূপ নিয়েছে। যখন যারা ক্ষমতায় থাকে নদীটিতে বাধঁ ও জাল দিয়ে মাছের খামার করে রাখে। ফলে কখনোই দখলমুক্ত হয়না। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে প্রভাবশালী দখলদারদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না তারা। ২০১৭ ও ২০২২ সালে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে নদীটি দুইবার দখলমুক্ত করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই ফের প্রভাবশালীরা বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ শুরু হয়। এখনো একই অবস্থা চলছে।

স্থানীয়রা জানায়, বিগত ২০০৯ সালের পর সে সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নদী দখল করে বাঁধ দিয়ে চিংড়ি, বাগদা, গলদা, রুই, কাতলাসহ নানা প্রজাতির মাছ চাষ করতেন। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে বর্ষায় জলাবদ্ধতা, কৃষিজমি ক্ষতিসহ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। 

২০১৭ সালের ১০ মে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তৎকালীন সদর উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ডেমা ইউনিয়নের খেগড়াঘাট ব্রিজের নিচের অবৈধ বাঁধ অপসারণ করে। তবে এক মাসের মধ্যে দখলদাররা ফের বাঁধ নির্মাণ করে। ২০২২ সালেও একইভাবে নদী দখলমুক্ত অভিযান চালানো হয় এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও নদী ভাগ করে মাছ চাষ শুরু হয়।

হোজির নদীটি বছরের পর বছর ধরে বাঁধ ও জাল দিয়ে ভাগ করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ছবি: ইত্তেফাক

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সরকারের অভ্যন্তরীণ ছোট নদী, খাল ও জলাশয় খনন প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে ৮.৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হোজির নদীর পুনঃখননের কাজ শুরু হয়। কিন্তু নানা বাধা ও প্রভাবশালীদের চাপের কারণে পুরো খনন কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। মাত্র ৬ কিলোমিটার খনন সম্পন্ন হয় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ কোটি টাকা বিল পেলেও স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ এর সুফল পাননি।

ডেমা ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা জলিল শেখ ও ইব্রাহিম হোসেন বলেন, খেগড়াঘাট ব্রিজের নিচে আড়াআড়ি নেটপাটার বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এভাবে চারটি স্থানে দুই প্রান্তে  নেট জাল টানিয়ে নেতারা ঘের ভাগ করে নিয়েছে। 

নদী পাড়ের বাসিন্দা সলেমান হাওলাদার বলেন, যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতাকর্মীরা নদী দখল করে। আমাদের নদীর পানি ছোঁয়ারও অধিকার নেই। মাছ ধরা তো দূরের কথা।

একই গ্রামের বাসিন্দা সত্তার শেখ বলেন, একসময় আমি এই নদীতে  নৌকা চালিয়েছি, জাল দিয়ে মাছ ধরেছি। এখন এখানে যাওয়াই অপরাধ মনে হয়। এটা আর নদী নেই, এটা এখন সরকারি নদী নামের মালিকানাধীন মৎস্য ঘের।

ডেমা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শেখ নিজাম উদ্দিন বলেন, এটা যে নদী, বিষয়টি আমরা সবাই জানি। আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দখল করে মাছ চাষ করতেন, ৫ তারিখের পর আওয়ামী লীগের লোকজন পালিয়ে গেলে বিএনপির কয়েকজন নদীটি দখল করে মাছ চাষ করছে। আমাকেও শেয়ারের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমি জড়াইনি। দখল, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির জন্য আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, আমরাও যদি সেই পথে হাঁটি তাহলে আমাদের অবস্থাও তাদের মতো হবে। নদী সবার, এটা দখল করা উচিত নয়।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল-বিরুনী বলেন, পূর্বে একাধিকবার উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও প্রভাবশালীরা আবারও নদীটি দখল করেছে। সম্প্রতি নতুন করে দখলের বিষয়ে আমরা অবগত ছিলাম না, তবে দ্রুত প্রশাসনের সঙ্গে মিলিত হয়ে উদ্ধার অভিযান চালানো হবে।

বাগেরহাট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি খাল ও নদী দখল করে মাছ চাষ বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার আইনত অপরাধ। বিষয়টি জানা ছিল না, নদীটি উদ্ধারে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি