ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের নেতারা রোববার (১৭ আগস্ট) ইউক্রেনের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করবেন, যখন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি চুক্তি গ্রহণে চাপ দিচ্ছেন।
শুক্রবার আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প ইউক্রেনকে চুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের ছোট কিছু দখলকৃত এলাকা ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন—বিনিময়ে বিশাল অংশ চেয়ে নিয়েছেন।
পুতিনের এসব দাবি সরলভাবে দেখলে ইউক্রেনের জন্য মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইউরোপের গত ৮০ বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ, যেখানে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে, তা শেষ করতে আলোচনার পথ সহজ হবে না।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার রবিবার জিএমটি ১৩টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৭টা) “কোলিশন অব দ্য উইলিং”—ইউক্রেনের মিত্রদের ভার্চুয়াল বৈঠক আয়োজন করবেন। খবর রয়টার্সের।
ইউরোপীয় শক্তিগুলো চাইছে ট্রাম্প, পুতিন ও জেলেনস্কিকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ব্যবস্থা করতে, যাতে ইউক্রেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে টেবিলে আসন পায়। পাশাপাশি, তারা চায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, এবং প্রয়োজনে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর ক্ষমতা।
এক ইউরোপীয় সরকারি কর্মকর্তা জানান, “তারা ব্যাখ্যা করবেন কোন বিষয়গুলো নিরাপত্তা নিশ্চয়তার জন্য অপরিহার্য—কী তারা নিজেরা করতে পারবেন, কী স্বেচ্ছাসেবক জোট করবে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করবেন। আসলেই তারা খুবই শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি আশা করছে।”
এমনকি ইউরোপীয় কোনো নেতা জেলেনস্কির সঙ্গে সোমবার ওয়াশিংটনে যাওয়ার সময় সঙ্গেও থাকতে পারেন।
শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের উচিত রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়া, কারণ “রাশিয়া অনেক বড় শক্তি, আর তারা (ইউক্রেন) নয়।”
আলাস্কা সম্মেলনের পর ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ফোন করে জানান, পুতিন প্রস্তাব দিয়েছেন—কিয়েভ যদি সমগ্র দোনেৎস্ক অঞ্চল ছেড়ে দেয়, তবে রাশিয়া বেশিরভাগ ফ্রন্টলাইন স্থির রাখতে রাজি। কিন্তু সূত্র বলছে, জেলেনস্কি ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের পাঁচ ভাগের একভাগ দখল করে আছে, যার মধ্যে দোনেৎস্ক প্রদেশের তিন-চতুর্থাংশ অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তারা প্রথম প্রবেশ করে ২০১৪ সালে।
ট্রাম্প আরও জানান, তিনি পুতিনের সঙ্গে একমত হয়েছেন যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজন নেই। অথচ সম্মেলনের আগে তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি ছাড়া তিনি খুশি হবেন না।
জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়ার অনিচ্ছা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। এক্স-এ তিনি লিখেছেন, “হত্যা বন্ধ করাই যুদ্ধ থামানোর মূল উপাদান।”
এদিকে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া শনিবার রাতে ৬০টি ড্রোন ও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে ৪০টি ভূপাতিত বা জ্যাম করা হয়েছে।
ওভাল অফিস বৈঠকের প্রস্তুতি
ফেব্রুয়ারিতে জেলেনস্কির সর্বশেষ ওভাল অফিস বৈঠক ছিল ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক; সে সময় ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তাকে প্রকাশ্যে তীব্র ভর্ৎসনা করেন।
তবে জার্মান চ্যান্সেলর মের্জ বলেছেন, এবারের বৈঠক ততটা কঠিন হবে না। তিনি জানান, রবিবার ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক হবে, যেখানে তাকে পরামর্শ দেওয়া হবে।
মের্জ জার্মান টেলিভিশনকে বলেন, “আমরা কিছু ভালো পরামর্শ দেব।” তিনি আরও বলেন, ইউরোপের ঐক্য জরুরি হলেও, আপাতত যুদ্ধের নিয়ামক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রই থাকবে।
“আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা রয়েছে, পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক প্রয়োগ করে রাশিয়াকে আগের তুলনায় বেশি নড়াতে পারেন,” তিনি যোগ করেন।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ চালায় এবং মাসের পর মাস ধরে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।
আলাস্কা সম্মেলনের পর পুতিন জানিয়ে দেন, রাশিয়ার দীর্ঘদিনের দাবিতে কোনো ছাড় নেই—এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদে রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা।
ব্রিটেনের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্ক লায়েল গ্রান্ট বলেন, এ সম্মেলন পুতিনের জন্য “স্পষ্ট জয়”, কারণ ট্রাম্প তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির দাবি থেকে সরে এসেছেন।
তবে তিনি এটিকে ইতিবাচকও মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত কিছু নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “ভূমি বিনিময়ের বিষয়টি জটিল হলেও, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অবশিষ্ট ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—যাতে পুতিন আবার সময় নিয়ে অস্ত্র সঞ্চয় করে ভবিষ্যতে নতুন হামলায় নামতে না পারে।”
