আগামী ২০২১ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় উত্পাদনশীলতা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল প্রোডাকটিভিটি অর্গানাইজেশন (এনপিও)। এর মধ্যে কৃষি খাতে গড়ে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, শিল্প খাতে ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৬ দশমিক ২ শতাংশ হারে উত্পাদশীলতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। উত্পাদনশীলতার উন্নয়নে প্রণীত ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় এ লক্ষ্য জানিয়েছে এনপিও। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাতে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের গুণমান, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত করা হবে। এর আগে ১৯৯৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রম উত্পাদনশীলতা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে এনপিও সদস্যভুক্ত এশিয়ার ২০টি দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
শ্রমের উত্পাদনশীলতার বিষয়টি যে কোনো দেশের উন্নতির জন্য উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর্মক্ষম নাগরিকদের শ্রম দেওয়ার ক্ষেত্রে যে দেশ যত বেশি উন্নতি করেছে, সেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তত বেশি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং বিশ্বায়নের ধাক্কা মোকাবিলায় সফল হয়েছে। এর কারণ— শ্রমের উত্পাদনশীলতার সক্ষমতার সঙ্গে উন্নতি ও পণ্যের মূল্য সরাসরি সংশ্লিষ্ট। তাই বতর্মান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে উন্নয়নকামী বেশিরভাগ দেশ তার নাগরিকদের শ্রমের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে এ চিত্র ভিন্ন, বিশ্বপর্যায়ের তুলনায় অত্যন্ত নিচু। এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের ডাটাবুক-২০১৮ অনুযায়ী, ১৯৯০-২০১৬ সাল পর্যন্ত শ্রম উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করে প্রথম অবস্থানে রয়েছে চীন (৮.৭%), দ্বিতীয় ভিয়েতনাম (৫%), তৃতীয় ভারত (৪.৯), চতুর্থ শ্রীলঙ্কা (৩.৯%), পঞ্চম বাংলাদেশ ও মিয়ানমার (৩.৫%), ষষ্ঠ থাইল্যান্ড (৩.৩%), সপ্তম পাকিস্তান (২.১% ), অষ্টম নেপাল (১.৮)। অর্থাত্ উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা চীনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। শ্রমের এই উত্পাদনশীলতা কম হওয়ার কারণেই আমরা বিশ্বায়নের ধাক্কা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছি। বাংলাদেশে শ্রমের উত্পাদনশীলতা অত্যন্ত নিচু পর্যায়ের হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অদক্ষতা এবং শিক্ষাপদ্ধতি আধুনিক ও কর্মমুখী না হওয়া। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে যা শিখছে, কর্মক্ষেত্রে এসে তার কোনো প্রয়োগ দেখাতে পারছে না। ফলে তাদের আউটপুট অর্থাত্ কাজের মান ভালো হয় না, নানা কারণে একসময় যা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। দক্ষ প্রশাসনের অভাব ও দুর্নীতির বিস্তার প্রভৃতি কারণে অযোগ্য লোকেরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত হচ্ছে, স্বভাবতই তাদের কাজের মান প্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে শ্রমের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশের ভীষণ অভাব- যন্ত্রপাতি সেকেলে, যাও-বা আছে যত্নের অভাবে সেসব ব্যবহারযোগ্য নয়। চাকরিতে প্রবেশের পর উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির বেশিরভাগই যোগ্য কর্মীর ভাগ্যে জোটে না। এতে করে মেধাবী কর্মীরা একসময় হতাশ হয়ে কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলে। হতাশ কর্মীর উত্পাদনশীলতা কখনোই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের হয় না। শ্রমের উত্পাদনশীলতার পাশাপাশি অটোমেশন, রোবট, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা— প্রভৃতিতে সম্ভাব্য সবই বিনিয়োগ করছে। ফলে তাদের উত্পাদনশীলতা বাড়ছে, পণ্যের মূল্যও বাড়ছে। বাংলাদেশ ইদানীং প্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝতে পারছে, কিন্তু শ্রমের উত্পাদনশীলতায় এখনো অনেক পিছিয়ে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে হলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকদের শ্রমের উত্পাদনশীলতা বাড়াতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
