ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন, তিনি গাজা সিটি দখলের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে হামাসের সঙ্গে বন্দিমুক্তি ও প্রায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনার নির্দেশ দিয়েছেন, তবে তা কেবল 'ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্য শর্তে'।
বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) গাজার নিকটে মোতায়েন সৈন্যদের উদ্দেশে ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, গাজা শহর দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ঘনবসতিপূর্ণ এই ফিলিস্তিনি নগরীতে অভিযানের অর্থ হলো প্রায় এক মিলিয়ন মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা।
নেতানিয়াহু বলেন, 'আমি আমাদের সকল বন্দীর মুক্তি এবং ইসরায়েলের শর্তে যুদ্ধের অবসান নিয়ে অবিলম্বে আলোচনা শুরুর নির্দেশ দিয়েছি। আমরা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে।' তিনি আরও জানান, জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর কয়েক দিনের মধ্যেই গাজা সিটিতে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে।
গত ১০ দিনে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে হামলা জোরদার করেছে। ট্যাংকের অগ্রযাত্রার কারণে গাজার হাজারো মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
আল জাজিরার সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা নেতানিয়াহুর ঘোষণাকে 'আগুন নিয়ে আলোচনা' আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'নেতানিয়াহু একদিকে যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন, অন্যদিকে গাজা সিটিতে সামরিক আগ্রাসন বাড়াচ্ছেন। এর মানে যুদ্ধ বন্ধ হবে না, গণহত্যায় কোনো বিরতি আসবে না।'
তার মতে, ইসরায়েল শত শত ফিলিস্তিনি হত্যার পাশাপাশি দক্ষিণ গাজায় এক মিলিয়ন মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে। 'ইসরায়েল এখন সব শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে এবং কারও মতামত শোনার প্রয়োজন বোধ করছে না। তাদের কাছে ওয়াশিংটনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে,' বিশারা বলেন।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৬ জন ছিলেন ত্রাণপ্রত্যাশী, যারা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ত্রাণকেন্দ্রে সাহায্যের অপেক্ষায় ছিলেন। একই দিনে গাজায় আরও দুজন অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি অবরোধে অনাহারে প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৯ জন, যাদের মধ্যে ১১২ জন শিশু।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (UNRWA) জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুতি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে।
গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গাজা সিটি দখলের ইসরায়েলি পরিকল্পনাকে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য 'প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড' বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বাসিন্দাদের বঞ্চিত করছে।
গাজার বাসিন্দারা এখন ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে উপকূলীয় আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন, কেউ আবার ছিটমহলের দক্ষিণাঞ্চলে পালিয়ে গেছেন।
৬৭ বছর বয়সী রাবাহ আবু এলিয়াস রয়টার্সকে বলেন, 'আমরা ভয়াবহ অবস্থায় আছি। বাড়িতে থাকলে মৃত্যু, আর পালালেও মৃত্যু। যুদ্ধ চলমান থাকলে বেঁচে থাকা অনিশ্চিত।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'সংবাদে আমরা যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুনি, কিন্তু বাস্তবে কেবল বিস্ফোরণ আর লাশ দেখি। গাজা সিটি ছেড়ে যাওয়া বা না যাওয়া – কোনো সিদ্ধান্তই সহজ নয়।'
এদিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দেইর এল-বালাহর একটি আশ্রয়শিবির ধ্বংস হয়েছে। বেঁচে যাওয়া পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের সামান্য সম্পদ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত মোহাম্মদ কাহলৌত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, তাদের মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল পালানোর জন্য। 'আমরা সাধারণ মানুষ, সন্ত্রাসী নই। আমাদের শিশুদের কী দোষ যে তাদের বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হচ্ছে?'
