শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্যের নতুন ফাঁদ ‘ডিটেনশন’। ক্লাসে পড়া না পারা বা হোমওয়ার্ক না করাসহ নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ডিটেনশনে পাঠানোর নামে ছুটি শেষে ১৫ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলে কোচিং না করা শিক্ষার্থীদের ওপরে চলছে ডিটেনশন নামক নির্যাতন।
ঢাকার নামকরা পাঁচটি স্কুলের ২০ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে স্কুল শিক্ষকদের কাছে কোচিং না করলে কম নম্বর দেওয়া হতো, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হতো। এখন কোচিং না করালে ডিটেনশনের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের কাছে এখন আতঙ্কের নাম ডিটেনশন। যেসব শিক্ষার্থী কোচিং করে, তারা ছুটি শেষে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে পারলেও, ডিটেনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত প্রায় আধা ঘণ্টা রুমের মধ্যে আটকে রাখা হয়। এ সময় খারাপ আচরণসহ নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে সব বিষয়ের শিক্ষকরা চান, তাদের কাছে ছাত্রছাত্রীরা কোচিং করুক। এটা নিয়ে অভিভাবকরা প্রতিবাদ করলেও প্রতিকার না পাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একশ্রেণির অধ্যক্ষ/প্রধান শিক্ষকরা। তারা পাচ্ছেন কোচিং-বাণিজ্যের টাকার ভাগ।
গত ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এফ-৭ বিজিআই মডেলের বিমানটি বেলা ১টার পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ নিহত হয়েছেন ৩৪ জন। নিহতদের মধ্যে ২৭ জনই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ছিল। দগ্ধ অনেকে এখনো হাসপাতালে চিকিত্সাধীন।
জানা গেছে, সেদিন ছুটি শেষে ডিটেনশন দিয়ে ৪০ শিক্ষার্থীকে আটকে রাখা হয়েছিল হায়দার আলী ভবনে। স্কুল ছুটির পর বড় বোন তাহিয়া আশরাফ নাজিয়া বের হতে কেন দেরি করছে, তা দেখতে গিয়েছিল আরিয়ান আশরাফ (নাফি)। তখনই যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়। নাজিয়ার শরীরের ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। আর নাফির ছোট্ট শরীরের প্রায় পুরোটাই পুড়ে গিয়েছিল। নাজিয়া মারা গেছে ২২ জুলাই, আর নাফি মারা যায় ২৩ জুলাই। নাজিয়া স্কুলটির ষষ্ঠ আর নাফি ছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। নাজিয়া সেদিন হোমওয়ার্ক করে যেতে পারেনি বলে ‘ডিটেনশনে’ ছিল, আর বোন কেন দেরি করছে, তা দেখতে গিয়েই আগুনে দগ্ধ হয় ছোট ভাই। নাজিয়া-নাফির বাবা আশরাফুল ইসলাম অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। সম্প্রতি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমার সম্পদ বলতে ছিল এই দুই সন্তান। দুই সন্তানই মারা গেছে। এক জনকে আইসিইউতে রেখে আরেক সন্তানকে দাফন করতে হয়েছে। বলতে পারেন, আমরা বেঁচে থাকব কীভাবে?’
গত মঙ্গলবার মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের বালক শাখার ৬ষ্ঠ শ্রেণির গ্লেলিও সেকশনে ক্লাস করছিল ৪২ জন শিক্ষার্থী। ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২৭ জন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে বের হয়ে অভিভাবকের কাছে আসে। কিন্তু ১৫ জন শিক্ষার্থী আসেনি। বাইরে অপেক্ষায় থাকা ১৫ শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের মধ্যে এক পর্যায়ে কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। ২০ মিনিট পরে অভিভাবকরা জানতে পারেন, ঐ ১৫ শিক্ষার্থীকে ডিটেনশনে রাখা হয়েছে। আধা ঘণ্টা পর ১৫ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে বের হয়ে আসে। এ সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর চোখে ছিল পানি। দুই জন অভিভাবক বলেন, ‘অঙ্কের একজন শিক্ষক গত কয়েক মাস ধরে তার কাছে কোচিং করতে শিক্ষার্থীদের বলেছে। তার পরও কোচিংয়ে না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন, নম্বর কম দিতেন। সবশেষ গত মঙ্গলবার কোনো কারণ ছাড়াই ডিটেনশনে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপরে মানসিক নির্যাতন করেছেন।
শিক্ষাবিদরা বলেন, স্কুল শেষে ডিটেনশন রাখা মানে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় ক্লাসে রেখে তাদের পড়াশোনা ও আচরণগত সমস্যাগুলো ঠিক করার চেষ্টা করা। কিন্তু ডিটেনশনের নামে শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতন করা অপরাধ। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ করতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘কোচিংয়ের কারণে বর্তমানে ক্লাসরুমে পড়াশোনা হয় না। ক্লাসে শিক্ষকরা শুধু পড়া দেন, আর পড়া নেন। আর বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেওয়ার কাজটি শিক্ষকরা কোচিংয়ে করান।
গণসাক্ষরতা অভিযানের একটি প্রতিবেদন মতে—দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অন্তত সাড়ে ৫ কোটি শিক্ষার্থী আছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪ কোটি ২৪ লাখ ছাত্রছাত্রী কোনো না কোনোভাবে মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে অর্থের বিনিময়ে কোচিং নিচ্ছে। এ সংখ্যা প্রায় ৭৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। প্রতি বছর কোচিং সেন্টারগুলো থেকে বাণিজ্য হয় ৪০ কোটি টাকা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েক জন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানেও টাকার পরিমাণের সত্যতা আছে।

