ভেদরগঞ্জ উপজেলার দুর্গম চরে ভাসমান তিনটি বাড়ি স্থানীয়দের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছিল। বন্যা-ঝড় যে কোনো দুর্যোগে বা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম এ ধরনের বাড়ি। এ বাড়িতে ছিল সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। পরিবেশবান্ধব এসব বাড়িতে বসবাসের পাশাপাশি ব্যবস্থা ছিল মাছ চাষ ও পোলট্রি খামার এবং সবজির বাগান। নাম দেওয়া হয়েছিল স্বপ্নের বাড়ি। এ বাড়ি তিনটি যত্নের অভাবে এখন বিলুপ্তির পথে। সেখানে বাড়িগুলোতে চলছে অসামাজিক কার্যকলাপ। ক্ষতি হচ্ছে এলাকার পরিবেশ।
সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর পদ্মার পাড়ে বাড়িঘর বন্যায় ডুবে যায় ও নদীভাঙনে বাড়িঘর ভেঙে যায়। এ কথা মাথায় রেখে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার দুর্গম চরমনাই হাওলাদারকান্দি গ্রামে তৈরি করা হয় তিনটি ভাসমান বাড়ি। কাঠের পাটাতনের নিচে ১৮৯টি প্লাসটিকের ড্রাম দিয়ে প্রতিটি বাড়ি ভাসিয়ে রেখেছে। এ বাড়িতে রয়েছে সোলার প্যানেল, বায়ু গ্যাস প্যানেলসহ রয়েছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা ও মুরগির খামার, সবজির বাগান, আর মাছ চাষের। এসবের আয় দিয়েই চলত তিনটি পরিবারের যাবতীয় খরচ। স্বপ্নের বাড়িটি ঘিরে হয়েছিল কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। দোকানগুলো জমে উঠেছিল দর্শনার্থীর ভিড়ে। এ দোকানের আয় দিয়ে চলত কয়েকটি পরিবার। বাঁশের তৈরি পানিতে ভাসমান ‘স্বপ্নের বাড়ি’ নামটি প্রত্যন্ত চর অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের দেওয়া।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিথ্রিআর) একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই তিনটি বাড়ি নির্মাণ করা হয়। বাড়িটির গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক আইনুন নিশাত। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান কুশলী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শুভ্র দাশ ভৌমিকের নেতৃত্বে স্থানীয় কারিগররা বাঁশ দিয়ে বাড়িগুলো নির্মাণ করেছেন। বাড়ির নকশা ও পরিকল্পনায় ছিলেন যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি গবেষক ড. নন্দন মুখার্জি। বাড়িগুলোতে সৌরবিদ্যুত্ স্থাপনে সহায়তা করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান ও তার দল। মনাই হাওলাদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দাদের চাহিদা ও পরামর্শকে আমলে নিয়ে বাড়ির নকশা তৈরি করেছেন সিথ্রিআরের কর্মীরা।
গ্রামের ছয়টি পরিবারকে বাড়িগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চারটি পরিবার সেখানে থাকত। বাকি দুটি পরিবার বাড়ির মুরগির খামার ও সবজি বাগান রক্ষণাবেক্ষণ করত। বাড়িগুলো থেকে মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় হতো। যা ছয়টি পরিবার সমানভাবে ভাগ করে নিতেন। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বিকালে পদ্মাপাড়ে ঐ তিনটি বাড়ির সামনে মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হতো। সেখানে চটপটি, ফুসকা, ঝালমুড়ি, আচার, কয়েকটি মুদি দোকানও বসেছিল। কর্মসংস্থান হয়েছিল অনেক বেকার যুবকদের। বাড়ি তিনটি ঐ এলাকার বুলবুলি বেগম, আমিরুন বেগম, জাহাঙ্গীর হোসেন, হাকিম মিয়া, সেকেন্দার ও নাজিম হাওলাদার নামে ছয়টি হতদরিদ্র পরিবারকে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি বাড়িতে দুটি পরিবার বসবাস করতেন।
এখন আর বাড়িতে কোনো লোকজন বসবাস করে না। পরিত্যক্ত বাড়িতে নানা রকম অসামাজিক কার্যক্রম চলে। সারাদিন জুয়ার আসর, গাঁজা, মদসহ নানা অবৈধ কার্যক্রম হয় সেখানে। বাড়িটি দেখার যেন কেউ নেই। বাড়ির অনেক উপকরণই এখন বাড়িতে নেই। রাতের আঁধারে কে বা কারা বাড়ি থেকে এসব উপকরণ নিয়ে গেছে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ বলেন, যারা এ বাড়িটি তৈরি করেছিল, তারা তৈরি করে চলে যাওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ বাড়িগুলো বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
