ছোটো-বড়ো অসংখ্য কারখানার কারণে ভাসমান মানুষের বসতি হয়ে উঠেছে সাভার এলাকা। আর ভাসমান মানুষের আধিক্যের কারণে সেখানকার শিশুদের জীবনমান অত্যন্ত নাজুক। স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর সন্তানদের সেখানে প্রায়ই ঘটছে ধর্ষণ, খুন, অপহরণ কিংবা পাচারের মতো সব ঘটনা। সাভার এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় সেখানকার শিশুদের পরিস্থতি।
সাভার, আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে শ্রমজীবী বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের দেখভাল করার জন্য প্রতিবেশী কিংবা নিজের শিশু সন্তানের কাছে রেখে কাজে যেতে হয়। এতে করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের শিশুদের রেখে যাচ্ছেন বয়স্ক পাড়াপড়শীদের জিম্মায়। ফলে সহজেই বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে শিশুরা।
সাভার ইমান্দিপুরের বাসিন্দা মো. হালিম মিয়া। তার ১০ বছর বয়সি মেয়ে (ছদ্মনাম) লামিয়াকে পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়ার বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যায়। সন্ধ্যা হয়ে এলেও, মেয়ে বাসায় ফিরে না আসায় খোঁজ করতে গেলে জানা যায়, পাশের বাসার মহিলা লামিয়াকে নিয়ে বেড়াতে গেছে। এরইমধ্যে লামিয়াকে ওই প্রতিবেশী মহিলা পাচারের উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেয়। রাতভর চলে লামিয়ার ওপর পাষবিক নির্যাতন। এরপর তাকে ওই বাসার ছাদে বস্তায় ভরে রাখা হয় পাচারের উদ্দেশ্যে। মেয়েটি পাচারের কথা জানতে পেরে কৌশলে পালিয়ে আসে। সাভার ব্যাংক টাউনের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে নাসিমা বেগম ও তার স্বামী আনিস। তাদের ৯ বছর বয়সি মেয়ে রাফিয়া (ছদ্মনাম)। তাদের প্রতিবেশী এক যুবক শিশুটিকে একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। স্থানীয়রা টের পেয়ে যুবকটিকে পুলিশে সোপর্দ করে। ১১ বছরের শিশু মুক্তা (ছদ্মনাম)। বাবা ভাঙারি ব্যবসায়ী সাভার ডগরমোড়া এলাকার বাসিন্দা আর মা গৃহকর্মী। পাশের ঘরের বাবুল মিয়া ডেকে নিয়ে রাতভর শিশুটিকে আটকে রেখে যৌন নির্যাতন চালায়। ভোর রাতে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায় বাবুল। পরে স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধার করে পরিবারে ফিরিয়ে দেয়। এমন ঘটনা কেবল লামিয়া, রাফিয়া কিংবা মুক্তার ক্ষেত্রেই নয়, সাভারে বসবাসরত শিশুদের জীবনে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। আর শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানদের সঙ্গে এ ঝুঁকি আরো কয়েকগুণ বেশি হয়ে।
সাভার শিশু রক্ষা মনিটরিং কমিটির সভাপতি রোকেয়া হক বলেন, সাভার এলাকায় শিশু নির্যাতন ঘরে ঘরে হচ্ছে। তবে এখন সচেতনতা বেড়েছে। বাল্যবিবাহ হতে গেলেই আমাদের কাছে চলে আসে। শিশু খুন, ধর্ষণ, অপহরণ এখানে হরহামেশায় হচ্ছে। এর মধ্যে শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানরা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে শৈশবেই এসব শিশু নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠছে।
সাভারে শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে কাজ করছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার (ভার্ক)। সংস্থাটি টিডিএইচ নেদারল্যান্ডসের আর্থিক সহযোগিতায় ২০১২ সাল থেকে শ্রমজীবীদের সন্তানদের জন্য এবং শ্রমজীবী শিশুদের জন্য ৪০টি উপানুষ্ঠানিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিশুকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে পড়ানো হচ্ছে। ভার্কের প্রকল্প সমন্বয়কারী প্রিয়তা খন্দকার বলেন, নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানদের জন্য সামাজিক কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। আমাদের স্কুলে শিশুরা তিন ঘণ্টা পড়ে, দিনের বাকি সময়টা তারা অরক্ষিতই থাকে। তার মতে এসব শিশুর নিরাপত্তার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ বলেন, পেটের তাগিদেই শ্রমজীবী বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানকে রেখে কাজে যান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আশপাশের অপরাধীরা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। তিনি বলেন, শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শিল্পাঞ্চলে নজরদারি বাড়াতে হবে। কোথাও কোনো শিশু নিপীড়নের শিকার হলে, অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
