ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্যোগে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় কূটনৈতিক সমাধান আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু আলোচনার সুযোগকেই সংকীর্ণ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সংঘাত ও যুদ্ধের ঝুঁকিও বাড়াবে। খবর আল জাজিরার।
বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য—ইউরোপের বৃহত্তম তিন অর্থনীতি—ইরানের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি বা জেসিপিওএ ভঙ্গের অভিযোগ তুলে 'স্ন্যাপব্যাক' নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ৩০ দিনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) নীতিনির্ধারণী পরিচালক রায়ান কস্টেলো আল জাজিরাকে বলেন, 'আমরা এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি যেখানে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসবে এবং ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেবে, যা উত্তেজনাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে।' তিনি সতর্ক করে বলেন, চলতি বছরের শুরুতে ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের প্রেক্ষাপটেই নতুন সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে। তার ভাষায়, 'এটা জুনের যুদ্ধের আগুন আবার জ্বলে ওঠার মতো আরেকটি ডমিনো পড়া।' যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইউরোপীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। জুনে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এখনো ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য প্রস্তুত। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, 'স্ন্যাপব্যাক কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং তা আরও শক্তিশালী করে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক সংকটের শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।'
তবে কস্টেলোর দাবি, ইরান ইতোমধ্যেই আলোচনার টেবিলে ফিরতে রাজি হয়েছিল। ১৫ জুন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকের কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই ইসরায়েল তেহরানের ওপর বিমান হামলা চালায়, যা আলোচনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেয়। তিনি মনে করেন, নতুন করে আলোচনায় ফিরতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে প্রথমে ইরানের আস্থা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। তার মতে, 'ইরানের জনগণের মধ্যে একটি প্রবল ধারণা রয়েছে যে আলোচনা ছিল একপ্রকার ছলনা, এবং যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালাবেই।'
‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা কী?
২০১৫ সালের জেসিপিওএ অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো পক্ষ যদি গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে, তবে একটি দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়—যেটিকে বলা হয় 'স্ন্যাপব্যাক'। এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ছয়টি পুরোনো প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হয়। বিশেষ বিষয় হলো, এটি ভেটো-প্রুফ, ফলে রাশিয়া বা চীনও চাইলে তা আটকে দিতে পারে না।
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে তিনটি শর্ত বেঁধে দিয়েছে। সেগুলো হলো—ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় ফিরতে হবে, জাতিসংঘের পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে এবং সাম্প্রতিক হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম মজুত কোথায় রাখা হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব শর্ত ইরানি নেতৃত্বের জন্য মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় তেহরান আলোচনায় অস্বস্তি বোধ করছে। তাছাড়া, আইএইএ ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার নিন্দা না করায় ইরান ইতোমধ্যে সংস্থাটির সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তি দিচ্ছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কিন্তু তেহরান পাল্টা অভিযোগ তুলেছে যে, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার মাধ্যমে ইউরোপই চুক্তি ভেঙেছে। বাস্তবে বেশিরভাগ দেশ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মার্কিন চাপেই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি আগেই গভীর সংকটে পড়েছে। জাতিসংঘের এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হলে বিদেশি দেশগুলোও একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে উৎসাহিত হতে পারে, যা ইরানের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করবে। ঘোষণার পরপরই ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান আরও পতন ঘটেছে।
২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের কঠোর নীতির ভারসাম্য রক্ষা করত ইউরোপীয় দেশগুলো। ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রকে জেসিপিওএ থেকে সরিয়ে নিলেন, তখন ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর ইউরোপের অবস্থান আমূল বদলেছে।
জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সময়ও তারা কোনো নিন্দা জানায়নি। বরং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ মন্তব্য করেন, 'এটা নোংরা কাজ হলেও ইসরায়েল আমাদের সবার জন্যই করছে।'
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, ইউরোপের এই নতুন অবস্থান মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা। তিনি বলেন, 'রাশিয়ার কাছে ড্রোন সরবরাহের অভিযোগে ইরানকে ইউরোপ এখন সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই ইউরোপ–ইরান বাণিজ্য প্রায় ভেঙে পড়েছে। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থী উপাদানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাকে ইউরোপ মূল্যবান মনে করছে।'
বর্তমানে পারমাণবিক ইস্যুতে উত্তেজনা চরমে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইরান বলছে, জেসিপিওএ চুক্তি তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি দেয়। বিশ্লেষক তোসি এ প্রসঙ্গে বলেন, 'ইউরোপীয় শক্তিগুলো এমন একটি ধারা ব্যবহার করছে যা ইরানের অধিকার নিশ্চিত করে, অথচ তারা সেটিকেই যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে মেলাতে চাইছে। এতে দ্বন্দ্ব ও ভণ্ডামি প্রকাশ পাচ্ছে।'

অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত বহিষ্কারকে ‘অযৌক্তিক’ বলল ইরান
ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথানত করবে না: খামেনি
ধাপে ধাপে এই বছরের মধ্যেই গাজা দখলের পরিকল্পনা ইসরায়েলের