যুগ পাল্টেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক হয়েছে যানবাহন। কিন্তু এখনো কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার চরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে একমাত্র ভরসা হয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ি। বৈশ্বিক উন্নয়নের দৌড়ে যেখানে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি ছুটছে শহর থেকে গ্রামে, সেখানে ধু-ধু বালুচরে মালামাল টানছে ঘোড়া আর কাঠের তৈরি প্রাচীন সেই বাহন।
ধরলা, বারোমাসিয়া ও নীলকমলসহ ফুলবাড়ীর নদী কেন্দ্রিক চরাঞ্চলে গরুর গাড়ি এখন অতীত। যুগের চাহিদা মেটাতে এবং চরাঞ্চলের দুর্গম বালুময় পথ পাড়ি দিতে এখন রাজত্ব ঘোড়ার গাড়ির। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন এটি।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের গোরকমন্ডল, চরগোরকমন্ডল, পশ্চিম ফুলমতি এলাকায় সরেজমিন দেখা যায় শত শত ঘোড়ার গাড়ি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন মালামাল পরিবহনে ব্যস্ত। স্থানীয় সূত্র বলছে, শুধু ফুলবাড়ী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নেই ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।
চরগোরকমন্ডল গ্রামের চালক আলামিন বলেন, আমরা আগে গরুর গাড়িতে পণ্য পরিবহন করতাম। কিন্তু গরু-মহিষের খাবার ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেশি। আর ঘোড়ার গাড়ি তুলনামূলক কম খরচে বেশি পণ্য পরিবহন করে।
একই এলাকার শহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, আমি প্রায় ৮ বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালাই। দিনে গড়ে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় করি। ঘোড়ার খাবারে খরচ হয় ২০০-২৫০ টাকা। বাকিটা দিয়েই সংসার চলে।
বালারহাট বাজারের কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, চরাঞ্চলে ট্রাক বা ভ্যান যেতে পারে না। সেখানে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা। তাই ঘোড়ার গাড়ি খরচ একটু বেশি হলেও লাভজনক।
চর এলাকার শিক্ষক ও স্থানীয় নাগরিকরা বলছেন, ঘোড়ার গাড়ি শুধুমাত্র পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি এখন চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, ঘোড়া এক সময় রাজা-বাদশার বাহন ছিল। এখন চরাঞ্চলে ঘোড়া পরিবেশবান্ধব ও কার্যকর যানবাহন হিসেবে ফিরে এসেছে। শহরে হয়তো এটি বিলুপ্ত, কিন্তু গ্রামে এখনো জনপ্রিয়।
চরগোরকমন্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন জানান, তার এলাকায় শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। প্রতিদিন এই গাড়িগুলো স্থানীয় বাজারে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্ষায় নদীতে পানি থাকায় নৌকা সহজলভ্য হলেও, শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া চরাঞ্চলের জীবন যেন স্থবির হয়ে পড়ে। আর তাই, আধুনিক যন্ত্রের যুগেও ফুলবাড়ীর চরাঞ্চলে টিকে আছে এই ঐতিহ্যবাহী বাহন, আর স্থানীয় মানুষের ভরসা এখনো ঘোড়ার গাড়ি।
