‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবেন। কিন্তু এখন আমার লেখাপড়ার খরচ কে দেবে? হয়তো আমার আর লেখাপড়া হবে না। বাবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।’- কথাগুলো বলে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাই এলাকার বাথুলীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শাহিনুল ইসলাম হালিমের একমাত্র সন্তান শিশির আহমেদ (১১)।
গত ১৬ জুলাই দুপুর একটার দিকে শুভ বসুন্ধরা পরিবহনের বেপরোয়া বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তার বাবা সাভারের সাহারা মেমোরিয়াল হাসপাতালের মার্কেটিং অফিসার শাহিনুর ইসলাম হালিম।
সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী শাহিনুর ইসলাম হালিমের মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন গৃহবধূ ফরিদা আক্তার। ছেলের ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কিত তিনি। কীভাবে সংসার চলবে, কোথা থেকে আসবে ছেলের লেখাপড়ার খরচ সেই চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।
ফরিদা আক্তার জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার আইড়মারা চরে। স্বামী শাহিনুর ইসলাম হালিম ও একমাত্র ছেলে শিশির আহমেদকে নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। অতিরিক্ত আয়ের আশায় গত বছর স্বামী হালিম ভিটেমাটি বিক্রি করে ও এলাকার কিছু মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে কাতার যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি দালালের প্রতারণার শিকার। একপর্যায়ে হাজতবাস করে দেশে ফিরে আসেন। এ সময় এলাকায় পাওনাদাররা টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। পরে বাধ্য হয়ে পরিবার নিয়ে তিনি সাভারে আশ্রয় নেন। সেখানে সাহারা মেমোরিয়াল হাসপাতালে মার্কেটিং অফিসার হিসেবে চাকরি নেন। চাকরির টাকা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি মানুষের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে থাকেন। গত ১৬ জুলাই পাওনাদারের এক লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে সাভার থেকে মানিকগঞ্জে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। ফরিদা বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর পর এখন একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কি করব বুঝতে পারছি না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে গোলড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফুল ইসলাম জানান, ১৬ জুলাই দুপুরে ধামরাইয়ে মানিকগঞ্জগামী শুভ বসুন্ধরা পরিবহনের একটি বাস (চট্ট মেট্রো ব-১১-০০৩৪) একটি মোটরসাইকেলকে সজোরে ধাক্কা দিলে এর চালক ও আরোহী ছিটকে পড়ে যান। এ সময় বাসটি বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি মোটর-সাইকেলকে সজোরে ধাক্কা দেয়, যেটি চালাচ্ছিলেন শাহিনুর ইসলাম হালিম। ধাক্কা খেয়ে মোটরসাইকেলসহ হালিম বাসের চাকার সঙ্গে আটকে যান। ঐ অবস্থায় বাস চালক গাড়ি না থামিয়ে হালিমকে ১৫/১৬ ফিট ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে নিয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি ছিটকে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান। আর এদিকে আটকে যাওয়া মোটরসাইকেলসহ বাসটি আনুমানিক ৫০০ ফুট যাওয়ার পর চালক মহাসড়কে বাস রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে হালিমের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ধামরাই থানায় মামলা হয়েছে। বাস চালককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ফরিদা আক্তারের অভিযোগ, ঘটনার পর ১০ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখনো বাসচালককে গ্রেফতার করতে পারেনি। বাসের মালিক কে বা বাসের কাগজপত্র আছে কি না তাও জানে না পুলিশ। এ অবস্থায় তিনি ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সন্দিহান।
