তাহলে কি আমরা হেরে যাব?

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৯, ১৯:২৯

মশার কাছে হেরে যাচ্ছি আমরা। তাদের মারতে মানুষ কামান দেগেও কুলিয়ে উঠছে না। নাকি মশাদের সঙ্গে ইচ্ছে করেই হেরে যেতে চাইছে কেউ কেউ?                গতবছরে ছিল চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ। এবার বেড়েছে ডেঙ্গুর অত্যাচার। মহামারী হয়ে দেখা দিচ্ছে। মৃত্যুর কাতারে নাম লেখাচ্ছে শিশু, নারীদের পাশাপাশি যুবারাও। হাসপাতালে রোগির জায়গা হচ্ছে না। রোগ থেকে ডাক্তাররাও ছাড় পাচ্ছে না। অথচ এরকমটা তো হওয়ার কথা ছিল না।

ঢাকা সিটিকে কাজের সুবিধার্থে দুভাগ করা হয়েছিল। যুগ উন্নত হয়েছে। মশা মারার উন্নত ওষুধও বের হয়েছে। মশা নামক প্রাণীদের এখন আর কোনোভাবেই মানুষের প্রবল শত্রুর তালিকায় থাকার কথা ছিল না।

অথচ, তারা আছে। বেশ ভালোভাবেই আছে। ফি বছর একটা পর একটা রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে। কখনো ম্যালেরিয়া, কখনো চিকুনগুনিয়া, কখনোবা ডেঙ্গু।

মশারা যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, ততটাই দুর্বল হচ্ছে আমাদের দেশের মশক নিধন কার্যক্রম। ভেজাল কয়েল তৈরির চল বেশ পুরনো। ভেজাল স্প্রেও বাজার দল করে নিয়েছে। এসব ভেজাল পণ্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সেই শুরুর দিকেই পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু, তা তো নেওয়া হয়ইনি উল্টো দিনকে দিন তাদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে।

এসকল কারণে যারা উন্নতমানের কয়েল, স্প্রে তৈরি করত, সেসকল বহুজাতিক কোম্পানি এখন লেজ গুটিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে (ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে)।

চট্টগ্রাম সিটি ফি বছর বর্ষা আসি আসি করলেই পানিতে ডুুব মারে। ঢাকা শহর অতটা রসিক তথা সাঁতারপাগল না হলেও তারও হাঁটুসমান পানিতে জলকেলি প্রায়ই করে। নদী ও খালগুলো দখল ও ভরাট হওয়ার পর যে সংকুচিত আকারের নালার অস্তিত্ব থাকে, তাতে মশা জন্মানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। আর একটা বিষয় হলো, আমাদের অলসতা। পানির পাত্র, ড্রেন, টব, ট্যাঙ্কি কিংবা ছাদের নিচু জায়গার জমে থাকা পানির প্রতি আমাদের কোনো ভ্রূক্ষেপ থাকে না। উপরতলা থেকে ময়লা সরাসরি নিচে ফেলি, ডাস্টবিনে না রেখে। বিদেশে বাবা-মায়েরা সন্তানদের ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার অভ্যাস শেখায়। আর আমাদের দেশে ‘ওয়াক! ডাস্টবিন ময়লা, ওখানে যায় না’ বলে সন্তানদের ডাস্টবিন থেকে দূরে রাখে।

ফলে আশপাশে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ জমে গেলেও, আমরা বিচলিত হই না। যুদ্ধবিধ্বস্ত সৈনিকের মতো রণেভঙ্গ দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকি। মশার কাছে যদি হেরেও যাই, তো সমস্যা কী!

 

দুই.

কথায় বলে, দুর্গন্ধ তাড়াতাড়ি বাতাসে ছড়ায়। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে, গুজব আলোর গতির থেকেও বেশি গতিশীল, যেখানে আমরা আলোকেই সবচে বেশি গতিতে চলতে পারে বলে মনে করি।

গুজবের জোরে চিলে আমাদের কান নিয়ে যায়। নিয়ে যায় প্রাণও। এতটাই বিবেকশূন্য হয়ে পড়ছি আমরা, সর্বদা হাত-পা নিশপিশ করতে থাকে আমাদের। কাউকে খাপমতো পেলেই হলো। পিটিয়ে শায়েস্তা করতে যাই। ভেবে দেখি না, এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার আমাদের কে দিয়েছে। কেউ অপরাধ করলেও তার বিচার আমরা করতে পারি না। বিচার করার জন্য আইন-আদালত আছে। অথচ, আমরা সুযোগ পেলেই অন্যের ওপরে হাত তুলি। পিটিয়ে হাতের সুখ নিই। সে যেমন দোষীর বেলায়, নির্দোষের ক্ষেত্রেও...

সবলদের ওপরে আমাদের স্বভাবতই কিছু জেদ থাকে। রাগ থাকে। ঈর্ষাও থাকতে পারে। সবলদের সঙ্গে না পেরে আমরা দুর্বলদের ওপরে হামলে পড়ি। একটা পশুও এভাবে কারো ওপরে হামলে পড়ে কি না সন্দেহ!

 

তিন.

চার বছরের তুবা তার মাকে হারিয়েছে। সন্তানের জন্য স্কুলের খোঁজে গিয়েছিলেন সেই মা। অথচ খোঁজ পেয়েছিলেন একদল অমানুষের।

ব্যক্তিগত জিঘাংসাগুলোও আমরা ইদানীং গুজবে রূপান্তরিত করে কার্য হাসিলের চেষ্টা করছি। সত্যকে আড়ালের চেষ্টা, মিথ্যেকে রং চড়িয়ে উপস্থাপনের এই মিথ্যে খেলায় আমরা কখন যে নিজেদের মনুষ্যত্ববোধই হারিয়ে ফেলছি, তা টের পাচ্ছি না।

প্রকাশ্যে খুন করা হলো রিফাতকে। কেউ দোষ দিচ্ছে নয়ন বন্ডকে, কেউ দোষ চাপাচ্ছে মিন্নির ঘাড়ে, কেউবা মন্ত্রিপুত্রকে কাঠগড়ায় তুলতে চাইছে। আমরা নিজেদের কেন কাঠগড়ায় তুলছি না? কোনো রিফাতকে সাহায্য করতে তো আমরা কখনো এগিয়ে আসছি না।

অথচ, একটা সময় তো আমরা এমন ছিলাম না। বরং একের বিপদে দশজন এসে তার পাশে দাঁড়াতাম। কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই তো এতটা পথ চলে এসেছি আমরা। বিশ্ব এখন চূড়ান্ত উন্নাসিকতার দ্বারপ্রান্তে। মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে। এই সময়ে আমাদের দেশে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা বেশি। যারা হতে পারে দেশের উন্নতির মূল হাতিয়ার। অথচ, তারাই বিকৃত পথে হাঁটছে। কেন একজন মানুষ অপরকে এভাবে মারবে? খুন করার বিষয়টাই বা তার ভেতরে কেন জেগে উঠবে? মানুষ তার ভেতরকার পশুপ্রবৃত্তিকে বশ করেই তো সভ্যতার উন্নতি ঘটাবে। তাহলে কেন উল্টোটা হচ্ছে? তাহলে কি আমরা পর্বতারোহন করতে গিয়ে শেষধাপের ওপরে না উঠে অতল খাদে পড়ে যাওয়ার অবস্থায় আছি? আমরা কি দীর্ঘপথ অতিক্রম করে শেষধাপে আলোর দেখা পাওয়ার আগেই কালের অন্ধকার গহ্বরে পতিত হবো? হেরে যাব আমরা?  g

[email protected]