ঈদের দিন। বাসায় মহব্বত আলী ভাই বেড়াতে এলেন। মধ্যবয়সী এই আত্মীয়কে নারিকেলের তৈরি পানতোয়া পিঠা খেতে দেওয়া হলো। তিনি বললেন, ‘এই পিঠা আমার বড়ই পছন্দ। সামনে পাইলে লোভ সামলাইতে পারি না। তাই চাপায় যতক্ষণ কুলায় ততক্ষণ খাইতে পারি।’ এ কথা বলার ফাঁকেই তিনি খেতে শুরু করলেন। সত্যি বলতে কী, এ ধরনের কথা শুনলে মেজবান খুব খুশি হয়। মেজবানের আপ্যায়ন মেহমানের পছন্দ হয়েছে, এটাই বিরাট আনন্দ। পিঠা খাওয়ার মধ্যেই তিনি ‘উহ’ করে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই কোনো সমস্যা?’ তিনি বললেন, ‘দাঁতে একটু লাগছে। তবে এইটা কোনো সমস্যাই না। কালকের ট্রেনেই ইন্ডিয়া যায়াম। দাঁতে ক্যাপ পরাইবাম।’ তিনি এমনভাবে ইন্ডিয়ার যাওয়ার কথা বলছেন যেন উনি ডাক্তার দেখাতে জেলা শহরে যাবেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সামান্য একটা দাঁতে ক্যাপ পরানোর জন্য আপনি ইন্ডিয়া যাবেন? আমাদের দেশে কি দাঁতের ডাক্তারের অভাব?’ আমার প্রশ্ন শুনে তিনি কাতলা মাছের মতো হা করে বললেন, ‘এই দেখো।’ দেখি তাঁর দুটো দাঁত নেই। নেই তো নেই, দাঁতের মাঁড়ি পর্যন্ত নেই। জানতে চাইলাম, ‘এ অবস্থা কেমন করে হলো?’ কিন্তু মহব্বত আলী ভাই জবাব দিতে পারছেন না। কারণ তার হা করা মুখটা বন্ধ করতে পারছেন না। আমি তার থুঁতনি ও মাথা চাপ দিয়ে মুখটা বন্ধ করতে সাহায্য করলাম। এবার তিনি স্বাভাবিক হয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘একবার আমার একটা দাঁতে ব্যথা হয়েছিল। ডাক্তারের কাছে গেছিলাম, তিনি কইল দাঁতের রুট নষ্ট হয়া গেছে, ফেলাইয়া দিতে অইব। অষুধ খেয়ে তিনদিন পর যাইতে কইল। গেলাম। তারপর আমার দাঁত ফেলাইল। আমার ব্যথা আরো বাড়ল। আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, যে দাঁতে ব্যথা ছিল, সেটা বলবত আছে, পাশেরটা ফেলায় দিছে।’
শুনে আমার চোখ তো কপালে, ‘কী বলেন! তারপর?’
‘তারপর আর কি, দুটো দাঁতই খোয়াতে হলো!’
দুই.
বাসার ছাদে ভাবিদের জমজমাট আড্ডা চলছে। টপিক :দৈনন্দিন চিকিত্সা। শিউলি ভাবি বলল, ‘আমি তো নিয়মিত ইন্ডিয়ায় গিয়ে চুলের ট্রিটমেন্ট নিই।’ তার কথা শুনে রুপা ভাবি বলল, ‘আপনার চুল তো বেশ সুন্দর ও মজবুত, তবুও চিকিত্সা কেন?’
তখন শিউলি ভাবি বলল, ‘ও কথা আর বলবেন না ভাবি, শুইলে আমার চুলগুলো বাঁকাত্যাড়া হয়ে যায়। চিরুনি করতে গেলে মাথায় ব্যথা লাগে। আমার আবার স্ট্রেইট চুল পছন্দ। দেশের চিকিত্সার ওপর তো আর ভরসা করতে পারি না। তাই মাসে একবার ইন্ডিয়াতে যাই চুল সোজা করতে।’
তিন.
পাড়ার বড় ভাই আশিক। ‘লাভার বয় আশিক’ নামে পরিচিত। লাভ ম্যারেজ করেছে মাস তিনেক আগে। পাসপোর্ট অফিসে গত কয়েকদিন যাবত দৌড়াদৌড়ি করছে। বিষয়টা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আশিক ভাই কি হানিমুনে দেশের বাইরে যাচ্ছেন?’
আশিক ভাই বললেন, ‘কেন রে ভাই? এ কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?’
‘না, দেখছি আপনি ভাবিসহ পাসপোর্ট করছেন।’
‘ও, সেই কথা। আসলে হচ্ছে কি তোমার ভাবির একটু পেটে ব্যথা তো, তাই ইন্ডিয়াতে নিয়ে যাব চিকিত্সা করাতে। বুঝই তো, দশটা না পাঁচটা না, একটামাত্র বউ আমার। এখানে চিকিত্সা করিয়ে অল্প বয়সে বউ হারানোর রিস্ক নিতে চাই না।’
আমি বললাম, ‘এসব কী বলছেন আশিক ভাই, চিকিত্সায় আবার রিস্ক কিসের?’ আমার কথা শুনে আসিক ভাই বললেন, ‘কেন পত্রিকায় দেখনি পাইলস অপারেশন করতে গিয়ে ডাক্তার গৃহবধূর জরায়ু কেটে ফেলেছে?’
এ কথা শুনে আমি আর কিছু বলতে পারিনি।
আমার চুপ থাকা দেখে আশিক ভাই বললেন, ‘বলতে পার, এদেশের অনেক মানুষ কারণে অকারণে কেন চিকিত্সার জন্য বিদেশের দ্বারস্থ হচ্ছে? ফ্যাশন, ট্র্যাডিশন নাকি আমাদের চিকিত্সকদের পেশাদারিত্বে অবহেলা?’
