খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দিবো কিসে? কিংবা আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই, ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ী যাই। কখনো বা পার হয়ে কত নদী কত যে সাগর, এই পারে এলি তুই শিশু যাদুগর। ছেলেবেলায় মায়েরা শিশুদের এ ধরনের অনেক ছড়া বলে ঘুম পাড়ায়। শিশুর ঘুম না আসা পর্যন্ত একটার পর একটা ছড়া বলেই যায়। শিশুদের নিয়ে তাদের কত স্বপ্ন, কত আশা। শিশুর ভবিষ্যত্ জীবন নিয়ে তারা স্বপ্নের জাল বুনতেই থাকে। অপর দিকে একটি শিশু পরিপূর্ণ জীবন, অনাবিল সুখ আর আনন্দ এবং সুন্দরের প্রত্যাশা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের অনেকেই পরিবার হারিয়ে অথবা পরিস্থিতির শিকার হয়ে গ্রামে কিংবা শহরে এসে সুবিধাবঞ্চিত শিশুতে পরিণত হয়। এসব শিশুরা চরম দারিদ্র্যতায় বাঁচার তাগিদে বাধ্য হয় শিশুশ্রমকে বেছে নিতে। এছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। দুঃখের বিষয় এসব শিশুর অনেকে শ্রম দিয়েও পারিশ্রমিক পায় না যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং অমার্জনীয়।
শিশু শ্রমিক নিয়োগ আইন, ১৯৩৮ এর ৩ ধারা মতে যে শিশুর বয়স পনের বছর পূর্ণ হয়নি তাকে রেল স্টেশন এবং কোনো বন্দরের সীমানার মধ্যে মাল উঠানো-নামানোর কাজ করতে দেওয়া যাবে না। কারখানা আইন, ১৯৬৫ এর ৭০ ধারানুযায়ী কোনো কারখানায় কোনো শিশুকে একদিনে ৫ ঘণ্টার বেশি এবং সন্ধ্যে ৭টা থেকে ভোর ৭টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কাজ করতে দেওয়া যাবে না। কারখানায় নিযুক্ত সকল শিশুর কাজের সময় দুটি শিফটে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। যেদিন শিশু এক কারখানায় কাজ করবে সেদিন তাকে আর অন্য কোনো কারখানায় কাজ করানো যাবে না। কারখানা বিধিমালা ১৯৭৯ এর ৪৯ (৯) ধারানুসারে শিশুদের মেশিন চালানো এবং ৫০ ধারানুসারে শিশুদের ৩৫ পাউন্ডের অধিক ভারী কোনো কিছু উত্তোলন করা নিষেধ। শিশুদের নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৫৫ এর ৮ ধারা অনুসারে একজন শিশুর প্রতিদিনের কাজের মেয়াদ ৬ ঘণ্টার অধিক হবে না। একজন উপযুক্ত মেডিক্যাল অফিসার যদি লিখিতভাবে এ মর্মে প্রত্যায়নপত্র দেন যে, সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কাজ করার দৈহিক সক্ষমতা শিশুটির আছে তবে তাকে নিয়োগ দেওয়া যাবে। ১৮ বছরের বেশি বয়সের একজন লোকের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে সকাল ১০টা ও বিকেল ৫টার মধ্যে শিশুটি কাজ করবে। দুটি কাজের সময় কালের মধ্যে একটানা অন্তত ১৩ ঘণ্টার জন্য বিশ্রাম গ্রহণের অনুমতি থাকতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি বাস্তবে শিশু শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব আইনের কোনোটাই একভাগ মানা হয় না।
বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর যন্ত্রপাতি, আগুন-গ্যাস, ধুলাবালি এবং ঝাঁকুনিপূর্ণ স্থান, প্রচণ্ড গরম এবং উত্তপ্ত, ভূগর্ভস্থ অথবা অতি উচ্চতায় অন্ধকার বা আবদ্ধ স্থানে পানি, রাসায়নিক ও বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করার কারণে শিশুদের কর্মস্থল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ ৮টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে উঠে এসেছে সামর্থ্যহীনতাই এর সবচেয়ে বড় কারণ। প্রায় অর্ধেক শিশুই সামর্থ্যহীনতার কারণে বিদ্যালয়ে যায় না। এছাড়া শিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা, গৃহস্থালির কাজে যুক্ত হওয়া, পিতা-মাতার অনাগ্রহ এবং বিদ্যালয় অনেক দূরে হওয়াও অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই একটি বড় অংশ বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। এদের কেউ বাস, টেম্পো, হিউম্যান হলারে সহকারী হিসেবে, কেউ কেউ চায়ের দোকান, হোটেল রেস্তোরাঁসহ মোটরগাড়ি ও রিকশার গ্যারেজ, সাইকেল নির্মাণ কারখানা, ইটভাটাসহ নানা ধরনের ছোটো ছোটো কারখানায় কাজ করছে। এছাড়া বাসা বাড়িতেও শিশু শ্রমিকেরা কাজ করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শিশুশ্রম সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মজীবী শিশু বড়োদের মতো পূর্ণকালীন কাজ করে। দেশে এমন শিশুর সংখ্যা সাড়ে ২৯ লাখ। মজুরি পায় না ১৬ লাখের বেশি শিশু। শুধু থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে তারা কাজ করে। আবার পূর্ণকালীন কাজ করে ৫ বছর কিংবা এর কম বয়সী শিশুরাও। সারাদেশে এমন শিশু শ্রমিক রয়েছে ১৩ হাজার ৯৫২ জন। অথচ তাদের স্কুলে যাওয়ার বয়সই হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে এ সমীক্ষাটি চূড়ান্ত করেছে বিবিএস। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ছেলে শিশু শ্রমিক রয়েছে সাড়ে ৯ লাখ। আর মেয়ে শিশু শ্রমিক রয়েছে সাড়ে ৭ লাখ। কৃষিক্ষেত্রে ও কলকারখানায় রয়েছে সবচেয়ে বেশি ১০ লাখ। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে ১২ লাখ ৮০ হাজার। ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। ৭ লাখ শিশু মজুরি পায় না। ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু এখন আর স্কুলে যায় না। বিবিএস এর মতে, সাড়ে ৩৪ লাখ কর্মজীবী শিশুর মধ্যে ২৯ লাখ ৪৮ হাজার পূর্ণকালীন কাজ করে। বাকি ৫ লাখ ২ হাজার খণ্ডকালীন কাজ করে। এরা পড়াশোনার ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে দৈনিক কমপক্ষে ২ ঘণ্টা কাজ করে। ১৭ লাখ শিশু রয়েছে যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনযোগ্য।
শিশুদের কাজের ধরনকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১৮ তম শ্রম পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং ২০১৩ এর সংশোধন অনুসারে কর্মজীবী শিশুশ্রম, শিশুশ্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের আলাদা সংজ্ঞা রয়েছে যা নিম্নরূপ: কর্মজীবী শিশুশ্রম: ১২ থেক ১৭ বছর বয়সী শিশু যারা সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টা হালকা পরিশ্রম বা ঝুঁকিহীন কাজ করে। এ শ্রম অনুমোদনযোগ্য। শিশুশ্রম: ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি কোনো ধরনের ঝুঁকিহীন কাজও করে, তবে তা শিশুশ্রম। এ শ্রম অনুমোদনযোগ্য নয়। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম: ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ যদি সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি কাজ করে, সেটা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে স্বীকৃত। এ শ্রমও অনুমোদন যোগ্য নয়।
বিবিএস-এর তথ্যানুযায়ী কর্মজীবী শিশুদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই স্কুলে যায় না। আগে স্কুলে গেলেও এখন আর যায় না, এমন কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ২১ লাখ। আর মাত্র ১০ লাখ শিশু পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কাজ করে। তবে পৌনে ৩ লাখ শিশু কোনোদিন স্কুলের পথে পা মাড়ানোর সুযোগ পায়নি। ২৮ শতাংশ শিশুর পরিবারের সদস্যরাই চাননি, তাদের সন্তানেরা স্কুলে যাক।
অন্যদিকে সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার বেশি বা দৈনিক গড়ে ৫ ঘণ্টার বেশি করে বা ঝুঁকিপুর্ণ কাজে নিয়োজিত ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুর মজুরি খুবই কম। প্রায় ৪ লাখ শিশু মজুরিই পায় না। ২০১০ সালের প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নির্মূল নীতিমালায় শিশুশ্রম নির্মূলের কথা বলা হয়েছে। শিশুশ্রম নির্মূল করার চেয়ে বন্ধ করা উচিত। শিশুশ্রম বন্ধে নীতি নির্ধারকদের শুধু কাগজে কলমে ভূমিকা পালন করলেই চলবে না। বরং বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবমুখী দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিশু শ্রমিকদের এদেশে বাসযোগ্য করতে হলে তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নত জীবনের নিশ্চিয়তার মাধ্যমে তাদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দিতে হবে।
n লেখক :সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা
