লাগামহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, যানজট

সড়ক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ 
আগামী মাস থেকে নামবে ডিএনসিসির নিবন্ধিত রিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:০০

রাজধানীর উড়ালসড়ক, মূল সড়ক, সরু গলি সর্বত্রই এখন অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট। উচ্চগতির রিকশায় হঠাৎ ব্রেক, দ্রুতগতিতে মোড় নেওয়া, কোনো ধরনের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতার কারণে সড়কে এটি এখন এক আতঙ্কের নাম। সড়কে সিগন্যাল ভাঙা, উলটোপথে চলাসহ পুরো ট্রাফিক সিস্টেমকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে এই অটোরিকশা। সড়কে ট্রাফিক পুলিশ তাদের জব্দ ও জরিমানা করেও কুলাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন থেকেও এসব অটোরিকশার নিবন্ধন বন্ধ রয়েছে। তবে সম্প্রতি উত্তর সিটি করপোরেশন একটি নিরাপদ বাহন হিসেবে বুয়েটের তৈরি নকশা অনুযায়ী অটোরিকশার অনুমোদন দিতে যাচ্ছে। জানা গেছে, বুয়েট থেকে তৈরি করা নকশাটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যাতে যেসব প্রতিষ্ঠানের এগুলো বানানোর সক্ষমতা আছে, তারা যেন এটি তৈরি করতে পারে। ডিজাইন অনুযায়ী বানানো হচ্ছে কি না, কোনো সমস্যা আছে কি না এসব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই করছে সিটি করপোরেশন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানান, 'আগামী মাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে দুইটি জোনে এই নিরাপদ বাহন হিসেবে এটি চালু হচ্ছে। আমরা তাদের পাঁচ বছরের জন্য লাইসেন্স দেব। এর মধ্যে একবার ফিটনেস পরীক্ষা করা হবে। প্রতি মাসে তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ রোড পারমিট চার্জ দেবে। এছাড়া এসব রিকশাচালককে আমরা প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যেন নতুন রিকশা পেলে সড়ক নিরাপত্তা ও চালানোর বিষয়ে তারা আগে থেকেই প্রশিক্ষিত থাকে। প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ১ লাখ রিকশাচালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এই কাজ চলমান আছে। এসব রিকশা যেন মূল সড়কে উঠতে না পারে, সেটারও ব্যবস্থা নিচ্ছি। নতুন রিকশাগুলো নামতে শুরু করলে ধীরে ধীরে আগের অনিরাপদ রিকশাগুলো সড়ক থেকে উঠে যাবে।'

তিনি আরো বলেন, 'নতুন রিকশাগুলোতে ডিভাইস দেওয়া থাকবে, যা মূল সড়কে বা অন্য জোনে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। তারা এক জোন থেকে অন্য জোনে যেতে পারবে না। আমরা এখন চিহ্নিত করছি কোন কোন এলাকায় কত সংখ্যক রিকশার প্রয়োজন। এরপর আমরা সেসব এলাকার জন্য রিকশার নম্বর প্লেট এবং চেসিস নম্বর দেব। যখন কোনো জোনে আমরা এসব রিকশার অনুমোদন দেব, তখন ঐ এলাকায় অন্য কোনো রিকশা আমরা আর ঢুকতে দেব না।'

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন অসংখ্য ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় নামছে। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই চালকেরা এসব রিকশা চালাচ্ছেন। ফলে ট্রাফিক আইন মানা, সড়ক সংকেত বোঝা কিংবা যাত্রীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে তাদের ধারণা প্রায় শূন্য। এতে শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে ঝুঁকি বাড়ছে কয়েক গুণ।

সরেজমিনে রাজধানীর খিলগাঁও, মগবাজার-মৌচাক, রামপুরা ও শান্তিনগরসহ একাধিক ফ্লাইওভার ঘুরে অবৈধ এই বাহনের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা গেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফ্লাইওভারগুলোতে অটোরিকশাগুলোকে প্রতিযোগিতায় নামতে দেখা যাচ্ছে। মৌচাক ফ্লাইওভারেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে সকাল ও বিকালে শত শত যাত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশায় চড়ে ফ্লাইওভার অতিক্রম করছে। এসব রিকশার কারণে ফ্লাইওভারে যানচলাচলের গতি কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র যানজটেরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ফ্লাইওভারটি। দ্রুতগতির গাড়ির জন্য নকশা করা উড়ালপথে দুর্বল কাঠামো ও ধীরগতির এই যান উঠলেই পুরো লেনের গতি কমে যাচ্ছে। অনেক সময় ফ্লাইওভারে উঠে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত এসব রিকশা। ফলে রাস্তা বন্ধ হয়ে তৈরি হচ্ছে যানজট।

গুলশান-বনানীতেও এই রিকশা ঢুকে পড়ায় বিরক্ত এখানকার বাসিন্দা ও চলাচলকারীরা। তারা জানায়, সিগন্যাল ভাঙা, উলটোপথে চলা, যাত্রী নিয়ে বেপরোয়া গতিতে ছোটা সবই চলছে নির্দ্বিধায়। ফলে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এতে দ্রুতগতির গাড়ি থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী- সবাই পড়ছে ঝুঁকির মুখে।

রাস্তায় এত বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা যে, তা নিয়মের মধ্যে বা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না পুলিশ। ট্রাফিক পুলিশ বলছে, ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা অবৈধ বাহন, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অনুমোদন নেই। অথচ ঢাকার যানজট ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বাধা এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা। ডিএমপির ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের শেরে-বাংলা নগর জোনের সহকারী কমিশনার জাকির হোসেন বলেন, 'আমাদের স্বাভাবিক ট্রাফিক পুলিশিং কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগারগাঁও মোড়ে হরহামেশা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢুকে পড়ছে। সিগন্যাল, রুট কিছুই মানে না। মানতেও চায় না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।'

ইত্তেফাক/এমএএম