বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত বিজ্ঞানী শুভ রায়। তিনি কিডনি সমস্যার সমাধানে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন। শুভ রায় ও তাঁর দলের আবিষ্কৃত প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম কিডনি নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই চলছে। এটি চিকিত্সাবিজ্ঞানে অসামান্য কীর্তি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আবিষ্কৃত এই কৃত্রিম কিডনি আসল অঙ্গের মতোই কাজ করতে সক্ষম। এই কিডনি রক্তের বিষাক্ত পদার্থ পরিশোধন থেকে শুরু করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ভিটামিন ডি তৈরি, সব কাজই করতে পারবে। সবকিছু ঠিকঠাক হলে হাতের মুঠোর মাপের এই কিডনি ২০২০ সালের মধ্যেই বাজারে চলে আসতে পারে। শুভ রায় ও তাঁর অনন্য কীর্তি নিয়েই ভিন্ন চোখের এবারের আয়োজন—
নুরুল করিম
বিভিন্ন পরিসংখ্যান দেখেই বোঝা যায়, কিডনি অকেজো হওয়ার হিড়িক পড়েছে বিশ্বজুড়ে। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৬ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ কিডনি অকেজো হওয়ায় চিকিত্সা নিচ্ছেন। এ জন্য দেশটির বার্ষিক চিকিত্সা ব্যয়ের মোট ৭ শতাংশ অর্থাত্ ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিডনি সংশ্লিষ্ট রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের হিসেব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি সংশ্লিষ্ট জটিলতায় ভুগছেন। দেশে প্রতি ৭ জনে ১ জন কিডনি রোগে ভুগছেন এবং প্রতিবছর ৪০ হাজার মানুষ দীর্ঘমেয়াদে কিডনি অকেজো হওয়ায় মারা যান এবং এই রোগীদের অধিকাংশই চিকিত্সার ব্যয় বহন করতে পারেন না।
কিডনি অকেজো হয়ে গেলে উপায়? আগে কোনো উপায় ছিল না। এখন আমাদের শুভ রায় আছেন। এই কিডনি সমস্যার সমাধানে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এই বিজ্ঞানী। শুভ রায় ও তার দলের আবিষ্কৃত প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম কিডনি নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই চলছে। এটি চিকিত্সাবিজ্ঞানে অসামান্য কীর্তি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আবিষ্কৃত এই কৃত্রিম কিডনি আসল অঙ্গের মতোই কাজ করতে সক্ষম। এই কিডনি রক্তের বিষাক্ত পদার্থ পরিশোধন থেকে শুরু করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ভিটামিন ডি তৈরি, সব কাজই করতে পারবে।
আমাদের শুভ রায়
তিনি একজন বাংলাদেশি, এটাই শুভ রায়ের কাছে সবচেয়ে গর্বের বিষয়। চিকিত্সক অশোক নাথ রায়ের ছেলে তিনি। তার মা রত্না রায় গৃহিণী। জন্ম ঢাকায়, ১৯৬৯ সালের ১০ নভেম্বর। তবে পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার রোসাংগিরিতে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কল্পনাপ্রবণ। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বিষয় তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করতো।
শুভ রায়ের বয়স যখন ৫ তখন ঢাকায় সিদ্ধেশ্বরীর একটি বিদ্যালয়ে নার্সারিতে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। কিন্তু ১৯৭৪ সালে চিকিত্সক অশোক নাথ রায়কে কর্মসূত্রে চলে যেতে হয়েছিল আফ্রিকার দেশ উগান্ডায়। উগান্ডার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনের অনুরোধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটিতে বাংলাদেশের যে মেডিকেল দল পাঠিয়েছিলেন ডা. শুভ রায়ের বাবা তার সদস্য ছিলেন। বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ ছেড়ে ছোট্ট শুভ ভর্তি হয়েছিলেন উগান্ডার জিনজা সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে। সেখানেই স্কুল জীবন শেষ করেন শুভ, তারপর পাড়ি দেন আমেরিকায়।
আমেরিকায় শুরু হয় শুভ রায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়টি। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর মাউন্ট ইউনিয়ন কলেজে (বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব মাউন্ট ইউনিয়ন) কম্পিউটার বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। ১৯৯৫ সালে কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি থেকে তড়িত্ কৌশল ও ফলিত পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি করেন। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করেন ২০০১ সালে।
শুভ রায়ের চিন্তা
ড. শুভ রায়ের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। তিনি ওহাইও’র ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর পদে যোগ দেন। তখন থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার তীব্র ইচ্ছে জাগে তাঁর। তাঁকে ভাবাতে শুরু করে মানুষের শরীরের অপার রহস্য। সেসময় চাকরির সঙ্গে তিনি খণ্ডকালীন সময় দিতেন ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে তিনি বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন।
এরপর ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ক্লিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির ফলিত বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামের সহকারী অধ্যাপক এবং কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির তড়িত্ প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেইসঙ্গে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মলিকুলার মেডিসিন বিষয়ে পড়ান লার্নার কলেজ অব মেডিসিনে।
শুভ রায় ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের নেফ্রোলজি বিভাগের অ্যাডজাংক্ট সহকারী স্টাফ হিসেবে যোগ দেন ২০০৯ সালে। সেসময়ই খুব কাছ থেকে তিনি দেখেছেন কিডনির অসুখে ভুগতে থাকা মানুষদের। জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা কিছু মানুষের মুখ তাঁকে রাতদিন ভাবাতো। দিনের শেষে ঘরে ফিরে কোনো কাজে মন বসাতে পারতেন না। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে লাগলেন, কিডনি অকেজো হলেই জীবনটা শেষ? অসহায় উত্তরটা ভালো লাগলো না শুভ রায়ের। শুভ বলেন, ‘সেসময়ের দিনগুলো খুব ভাবাতো। তখন থেকে খুব করে চেয়েছি কীভাবে সারাবিশ্বে কিডনির অসুখে ভোগা মানুষগুলোর জন্য কিছু একটা করা যায় কি-না। তখন থেকে নিজেকে খুব বেশি সময় দিইনি, এমনকি পরিবারকেও তেমন একটা সময় দেওয়া হয়নি। রাতের পর রাত জেগে কিডনির সূক্ষ্ম অংশগুলো ও তার কাজ নিয়ে পড়াশোনা করেছি।’
শুভ রায় ও ৪০ জনের সাফল্য
২০০৯ সালে শুভ রায় শুরু করেন এক দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জন অধ্যাপক ও গবেষককে নিয়ে শুরু করেছিলেন কৃত্রিম কিডনি তৈরির কাজ। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘন্টা চলেছিল নিরলস গবেষণা। একদিন ড. শুভ রায় ও তাঁর দল আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি! দেখতে যেন একটা কফির কাপ! ড. শুভ রায় বলেন, ‘কিডনিজনিত রোগে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপনের মানসম্মত বিকল্প হচ্ছে কৃত্রিম কিডনি। কফির কাপ আকারের যন্ত্রটি মানবদেহে স্থাপন করা হবে, যা সংশ্লিষ্ট রোগীর রক্ত সঞ্চালক অঙ্গ ও ক্ষতিগ্রস্ত কিডনির কাছেই সংযুক্ত থাকবে। এই কৃত্রিম কিডনি হরমোন তৈরি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত পরিশোধনসহ অধিকাংশ জৈবিক কাজ সম্পন্ন করবে।’
এক সংবাদ সম্মেলনে শুভ জানান, নিচপেটে, যেখানে শরীরের দু-পাশে আমাদের দুটি কিডনি রয়েছে সেখানেই যেকোনো একদিকে এই কফির কাপের মতো কৃত্রিম কিডনিকে বসিয়ে দেওয়া যাবে। তাকে চালাবে হার্ট থেকে আসা রক্তই। তবে সেই রক্তকে ফিল্টার করে নেবে ওই কৃত্রিম কিডনি। নজর রাখবে যাতে গুরুত্বপূর্ণ হরমোনগুলো শরীরে ঠিকভাবে তৈরি হয় আর সংশ্লিষ্ট গ্রন্থিগুলো (গ্ল্যান্ডস) থেকে সেই হরমোনগুলোর ক্ষরণ হয় পর্যাপ্ত পরিমাণে। শুধু তাই নয়, শরীরে রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজটাও করবে এই কৃত্রিম কিডনি।
কীভাবে কাজ করে কৃত্রিম কিডনি? এর উত্তরে শুভ রায় বলেন, ‘যন্ত্রটি সহজেই পেটের ভেতরে স্থাপন করা যায়। স্বাভাবিক কিডনির মতো রক্ত শোধন করা ছাড়াও হরমোন উত্পাদন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। সাধারণ হিমোডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ার মতো রক্ত থেকে বিষাক্ত বর্জ্য বাদ দেওয়া ছাড়াও জীবন্ত কিডনি কোষ দিয়ে তৈরি বায়ো রি-অ্যাক্টর এবং সূক্ষ্ম পর্দার মাধ্যমে রক্ত শোধনের কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারবে কৃত্রিম কিডনি।’
বাজারে আসছে কবে?
কৃত্রিম এই কিডনি একেবারে আসল কিডনির মতোই কাজ করবে। এরইমধ্যে কৃত্রিম এই কিডনি আমেরিকার কয়েক হাজার রোগীর দেহে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে। সেখানে ভালোভাবেই পাশ করেছে এই কিডনি। শুভ রায় জানান, এখন এই কৃত্রিম কিডনি আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ছাড়পত্র পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে হাতের মুঠোর মাপের এই কিডনি ২০২০ সালের মধ্যেই বাজারে চলে আসতে পারে।
কিছুদিনের মাঝেই হয়তো অনুমোদন মিলবে এই কিডিনির। তারপর বিশ্ব বাজারে কৃত্রিম কিডনি আসতে বেশি সময় নেবে না। কারণ দ্রুত উত্পাদনের পরিকাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। তখন কম খরচেই মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। শুভ রায়, তথা এই বাংলাদেশির সুনাম তখন ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে। তখন হয়তো সবাই বলবে—‘আমাদের শুভ রায়, আমাদের গর্ব।’
