ন্যাশনাল জিওগ্রাফির প্রচ্ছদে আসাদের ছবি

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:০৪

খোলা চোখে যা গভীরভাবে দেখা যায় না, সেই অদেখাকে চাক্ষুস করতেই ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখেছিলেন। প্রকৃতি থেকে মানুষ, সবই বন্দি হয়েছে তাঁর ক্যামেরায়। স্রেফ নেশার টানেই নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদটি নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন মাইলের পর মাইল। সময় কাটিয়েছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

কিন্তু এই অধ্যাবসায় যে তাঁকে এত বড় একটা স্বীকৃতি এনে দেবে, তা কখনো কী ভেবেছিলেন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী কে এম আসাদ? অনেক উচ্ছসিত হয়ে আসাদ বলেন, ‘এমনটাও যে সম্ভব তা তার জানা ছিল না।’ এবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফির প্রচ্ছদে উঠে এলো হূদয়ে তোলপাড় করা আসাদের এক ছবি। সেই ছবিতে ফুটে ওঠে সমুদ্রের তীরে হাঁটু পানিতে হাঁটছেন একজন মা, তাঁর কোলে রয়েছে শিশু। শিশুটির চোখই বলে দিচ্ছে সামনে অনিশ্চয়তা। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই কৃতিত্বে দাগ কাটলেন আসাদ।

 

ছবিটির নেপথ্যের গল্প

এই ছবিটি তোলা হয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। সেসময় মিয়ানমার থেকে প্রতিদিনই নদী পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকতো লাখ লাখ রোহিঙ্গা। অসহায় নারীরা প্রাণের তাগিদে দেশ ছেড়েছিল সন্তানদের আঁকড়ে। নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় নৌকায় চড়ে বসা, উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়া, দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, এসব তখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের বন্দর শহর কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলজুড়ে ছিল রোহিঙ্গাদের স্রোত। প্রতিবেশি দেশের এমন এক সঙ্কটকাল গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন আসাদ। সেই পরিস্থিতিকে ক্যামেরাবন্দি করতে দাঁড়িয়েছিলেন নাফ নদীর পাড়ে, শাহপরী দ্বীপের কাছে।

চোখ রেখেছিলেন প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের ওপর। একটি মুহূর্ত চমকে দেয় তাঁকে। ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয় তাঁর আলোকচিত্রী সত্ত্বাকে। তিনি দেখেন, এক মা তাঁর ছোট্ট ছেলেকে বুকে জড়িয়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলা হয় মায়ের কোলকে। সেখানে থেকেও ছোট শিশুটির চোখ-মুখজুড়ে ভয় আর আতঙ্ক। সেই মুহূর্তটিকেই তুলে রাখেন আসাদ।

 

যেভাবে নজরে আসে

আসাদের তোলা ছবিটি কালক্রমে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তা নজরে আসে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের। তিনি এই ছবিটিকে প্রচ্ছদ করার কথা ভাবেন। এরপর যোগাযোগ করা হয় এম কে আসাদের সঙ্গে।

কিন্তু ছবিটি কভার ফটো হিসেবে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে দেখা দেয় কিছু নীতিগত সমস্যা। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ছবি কভার ফটো হিসেবে ছাপার আগে তাঁর অনুমতি নিতে হয়। সেই অনুযায়ী ছবিতে থাকা মা ও শিশুর অনুমতি নিতে বলা হয়। কিন্তু আসাদ প্রশ্ন রাখেন, এত এত রোহিঙ্গার মাঝ থেকে কী আলাদা করে সেই মা-শিশুকে চিহ্নিত করা সম্ভব?

তিনি বলেন, ‘এটি কোনো ব্যক্তি কেন্দ্রিক ছবি নয়, বরং মানবসঙ্কটের একটা জ্বলন্ত দলিল হিসেবে ছবিটিকে দেখা হলেই যথার্থ বিচার করা হয়। আসাদের এই যুক্তির সঙ্গে সহমত হন জিওগ্রাফিকের সম্পাদকমণ্ডলী। আর তারপরই ছবিটি ছাপা হয় কভার হিসেবে।