বর্ষায় ডিঙ্গাপোতা হাওরে

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ১৯:০৫

মানুষ মাত্রই মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াতে চায়। মানুষ এমন এক জাতি, যারা বন্দি থাকতে মোটেও পছন্দ করে না। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। একটা সময় সবকিছু থাকতেও শুধুমাত্র সময়ের অভাবে মনের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর শখটাকে গলাটিপে ধরতে হয়।  ঘুরে বেড়াতে অনেক টাকার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু জগত্ সংসারে নানা ঝামেলায় ভ্রমণ শখ পূরণের জন্য সময় আর বের করা যায় না। তাই সময় কারো জীবনে নিষ্ঠুর হওয়ার আগেই ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ানো চাই!

হুট করেই এক রাতে সময়কে তুড়ি মেরে আমি আর মেহেদি কমলাপুর রেল স্টেশন গিয়ে উঠে পড়ি হাওর এক্সপ্রেসে। গন্তব্য ভাটি অঞ্চল মোহনগঞ্জ। অনেক বছর পর ট্রেনে চড়লাম। বাদ দিয়েছিলাম যে বছর খুলনা স্টেশনে ঢাকাগামী রাত ৯টার ট্রেন প্রায় ভোর রাতে স্টেশন ত্যাগ করেছিল। যাক এবার আর তেমন হয়নি। প্রায় পৌনে ১ ঘণ্টা লেট। হুইসেল বাজিয়ে ঝিকঝিক শব্দ তুলে ট্রেন ছুটেছে তার ঠিকানায়। তাপানুকূল কেবিন। বেশ পরিপাটি। কেবিন বয় নাশতার কথা জানালো। পেট ভরা তবুও হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই সার্ভ করতে দেরি হলো না। খেয়ে-দেয়ে দু’জনই খুব আরামের একটা ঘুম দিয়ে সকাল ৬টায় মোহনগঞ্জ রেল স্টেশনে নামলাম। অনেক বছর পর এদিকে এলাম। কালের পরিক্রমায় অনেককিছুই বদলে গেছে। যে বদলানোর ঢেউ মানুষের চরিত্রের ওপরও আঁছড়ে পড়েছে। রেল স্টেশনের পাশের হোটেলে সকালের নাশতা সারলাম। আমি আবার ভাটি অঞ্চলে এলে রাস্তার ধারের হোটেলগুলোতে পরোটা না খেলেই নয়। কেন জানি আমার কাছে অন্যরকম লাগে। এবার ফুপার বাড়িতে যাওয়ার জন্য অটোতে চড়লাম। চতুর চালক সম্ভবত ইচ্ছে করেই প্রথমে ভুল জায়গায় নিয়ে অতিরিক্ত কিছু টাকা খসালো। ওই যে বললাম না, চরিত্রের মাঝেও আঁছড়ে পড়েছে। গাড়ি ঘুরিয়ে এবার গার্লস স্কুলের সামনে এলাম। ফুপাতো ভাই তৌহিদ আগেই অপেক্ষায় ছিল। বিয়ে বাড়ি, অনেক স্বজন সমাবেশ। কিন্তু আমার মন তো পড়ে আছে হাওরের হিজল-করচ গাছের ছায়াতলে। কোনোমতে, সবার সঙ্গে হাই-হ্যালো সেরে ছুটলাম তেঁতুলিয়া। এবার মনে হয় ভাগ্য ভালো। অটোচালককে বেশ ভালোই মনে হলো। গ্রাম্য পথে অটো চলে। যেথায় খুশি সেথায় থামি।

মোহনগঞ্জ একটি প্রাচীন জনপদ। চালক রইস, আমাদের নানা অনুসন্ধানী প্রশ্নে একজন দক্ষ গাইডের মতোই ব্রিফিং দিচ্ছে। গ্রাম্য পথে চলার সময় বাড়তি আনন্দ জোগায় অচেনা পাখির সুর, পুকুরে দুরন্ত শিশুদের ডিগবাজি, কৃষাণ-কৃষাণীর হাসি। চলতে চলতে একটা সময় বুঝে গেলাম, এই অটোচালক আসলেই ভালো মানুষ। নানা আলাপচারিতায় ঘণ্টাখানেকের মাঝেই তেঁতুলিয়া গ্রামে পৌঁছালাম। গ্রামটা খুব সুন্দর। একেবারে ডিঙ্গাপোতা হাওরের তীরেই । গ্রামের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। এটা-সেটা দোকানিদের তাছ থেকে কিনে খাই। বলা যায়, এটা আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের অন্যতম হবি। ঘাটে গিয়ে আমরা ট্রলারে চড়ি। বিশাল হাওরের বুকে ভাসছি, চারদিকে থৈ থৈ নতুন পানি। ভটভট শব্দ তুলে ট্রলার ডিঙ্গাপোতা হাওরে ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরের এক হিজল গাছের ছায়ায় যাই আমরা। চারদিকে অথৈ পানি, মাঝে গাছটি শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এক অন্যরকম ভালোলাগার মুহূর্ত ছিল। তাছাড়া বর্ষাতে হাওরের সৌন্দর্য এমনিতেই বেড়ে যায় বহুগুণ। গাছের ডালের সঙ্গে লাগা পানির ছলাত্ ছলাত্ শব্দ, ট্রলার ছেড়ে গাছে চড়ি বসি। পা ভেজাতেই সারাদেহে অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম। নয়া পানিতে মাছের লুকোচুরি চলছে। মত্স্য শিকারিরাও যেন হন্তদন্ত, আমরা খুঁজে চলছি জীবনের সুখ। সেই সুখের খুঁজে উকিল মেহেদি বাঁদুড়ের মতো গাছের ডালে ঝুলতে গিয়ে ধপাস করে পানিতে পড়ল। ও হয়তো জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। শেষে  আরো কী খুঁজবে, কে জানে!। তাই আর দেরি নয়। মাঝি আবারো ট্রলার ভাসালো। রইস জানালো, শুকনো মৌসুমে এই ডিঙ্গাপোতা হাওরের বুকে বিভিন্ন জাতের ধান চাষাবাদ হয়। যা দেশের খাদ্য ভাণ্ডারের চাহিদা মিটাতে বেশ সহায়ক হয়। এই মোহনগঞ্জের হাওরগুলো থেকে প্রচুর মিঠাপানির মাছ পাওয়া যায়। ডিঙ্গাপোতা হাওর হয়ে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওর পর্যন্ত যাওয়া যায়। যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নতুন কিছু দেখার শখ মেটায়।  নীল আসমানের তলায় মৃদু বাতাসে, হাওর জলে ভাসতে ভাসতে বেলা গড়িয়ে প্রায় মধ্য দুপুর। দিনটি ছিল শুক্রবার। নিতে হবে নামাজের প্রস্তুতি। তাই চলে আসতেই হলো!

ভ্রমণ তথ্য: রাতের বাস বা ট্রেনে গেলে সারাদিন ঘুরে আবার রাতেই ঢাকা ফেরা যাবে।

 

যেভাবে যাবেন

 

বাস ও ট্রেন, দু-ভাবেই যাওয়া যায়। সবচাইতে আরামদায়ক হবে রাতের বাস বা ট্রেনে গেলে। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর থেকে সবসময়ই বাস, ট্রেন মোহনগঞ্জর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মোহনগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে অটোতে তেঁতুলিয়া নৌঘাট যেতে হবে। খরচ জনপ্রতি দুই রাত একদিনে মাত্র ২ হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট। অবশ্য এটা নির্ভর করবে আপনার বিলাসিতার ওপর।