বন্যার কারণে বগুড়ার তিন উপজেলায় গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষক ও খামারিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তিন উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। গো-খাদ্যের সংকটের কারণে গবাদি পশুদের একদিকে খাবার দেওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে বন্যার কারণে শুকনো স্থানে তাদের রাখাও যাচ্ছে না। যারা কোরবানির ঈদের জন্য গরু-ছাগল লালন-পালন করে আসছেন তাদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।
কোরবানির ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। কিন্তু নিয়মিত খাবার দিতে না পারায় এরই মধ্যে গরু-ছাগলগুলোর ওজন কমতে শুরু করেছে। এতে সেগুলোকে হাটে তুলে ভালো দাম না পাওয়ার আশঙ্কাও প্রবল হয়েছে।
বন্যায় প্লাবিত এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গবাদি পশু বিশেষ করে কোরবানির পশুগুলোর খাবার সংগ্রহের জন্য কৃষক এবং খামার মালিকদের মধ্যে রীতিমত হাহাকার পড়ে গেছে। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান গত ২২ জুলাই বগুড়ার বন্যাকবলিত এলাকা সফরের সময় গো-খাদ্যের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন। কিন্তু তা বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপই দৃশ্যমান নয়।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িঘর এবং খামারে নদীর স্রোত ঢুকে পড়ায় ঐ তিন উপজেলায় ১ লাখ ১২ হাজার গরু, ৫৬ হাজার ছাগল, ২৫ হাজার ভেড়া এবং ১ হাজার মহিষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৫ হাজার গরু, ৪৭ হাজার ছাগল এবং ২১ হাজার ভেড়া পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সারিয়াকান্দি উপজেলা এলাকায়।
বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় জানিয়েছে, বন্যার কারণে সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের ৩২০টি খামারের ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে। এতে গবাদি পশুর অন্যতম প্রধান খাদ্য ঘাসের যোগান বন্ধ হয়ে গেছে। আর খড় ও ভুসিসহ অন্যান্য পশুখাদ্য নষ্টের পরিমাণ ৫ হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। দুইটি গরুর মৃত্যু হয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা সদরের দক্ষিণ হিন্দুকান্দি গ্রামের মোশারফ হোসেন জানান, কোরবানির হাটে বিক্রি করবেন বলে তিনি একটি ষাঁড় লালন-পালন করছিলেন। কিন্তু বাজারে ঘাস না মেলায় গরুকে নিয়মিত খাওয়াতে পারছেন না। একই গ্রামের আশরাফ আলী জানান, বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় গরুকে নিয়ে তিনি রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ঘাস আর খড়ের অভাব দেখা দেওয়ায় তিনিও গরুকে প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়াতে পারছেন না। আশরাফ আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভুসি কিনা যে খাওয়ামো তারও দাম খালি বাড়িচ্চেই। ঠিকমত খাবার দিবার পারিচ্চিনা তাই গরুর স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে। এমন হলে কোরবানির হাটত তো দাম পামো না।’ ঐ গ্রামের গরুর বেপারি ফেকু ফকির জানান, কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য তিনি ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় ছোটো আকারের তিনটি গরু কিনেছিলেন। খাদ্যের অভাব হওয়ায় দুই দিন আগে সেগুলো ৬ হাজার টাকা লোকসানে অর্থাত্ ১ লাখ ৩৯ হাজার বিক্রি করে দিয়েছেন।
সারিয়াকান্দির যমুনার চরবেষ্টিত গ্রাম চরপাড়া ও মূলবাড়িতে গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় স্থানীয় একটি খামারের ৫০টি মহিষ নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন গোবিন্দ নামে এক রাখাল। শুক্রবার তিনি প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে গাবতলী উপজেলার অদ্দিরগোলা মাঠে অবস্থান করছিলেন। গোবিন্দ জানান, তাদের চরাঞ্চলে থইথই পানি। কোথাও এক ইঞ্চি শুকনো নেই। ক্ষুধার্ত মহিষগুলোকে খাওয়ানোর মতো এক মুঠো ঘাসও নেই। তাই বাধ্য হয়ে আরো দুই সহযোগীকে নিয়ে তিনি মহিষগুলোকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেসব মাঠে ফসল আছে সেখানে জমির মালিকরা মহিষ নিয়ে ভিড়তে দিচ্ছেন না। ফলে সবখানে মহিষগুলো খাবারও পাচ্ছে না।’
বুধবার ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ি হাটে ছাগল নিয়ে এসেছেন কামালপুর ইউনিয়নের রৌহদহ গ্রামের রফিকুল ইসলাম। তিনি কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাচ্ছেন না। ছাগল বিক্রি করতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোরবানির হাটত বেচমু জন্যি ৩ডা ছাগল পালছিলাম। কিন্তু এখন বাড়িঘরে পানি ওঠার পর নিজেই খাবার পাই না ছাগলেক কি খাওয়ামু। তাই বেচপ্যার আচ্চি।’ স্থানীয় গরুর বেপারি আব্দুল মোত্তালেব জানান, বন্যার কারণে যমুনা ও বাঙালি নদী তীরবর্তী বিশেষ করে চরাঞ্চলে গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় কেউ তাদের বাড়িঘরে গরু-ছাগল রাখতে পারছেন না। যে কারণে তারা কম দামে গরু-ছাগল বেচতে বাধ্য হচ্ছেন।’
সোনাতলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রহমত-উন-নবী জানান, নিয়মিত খাবার দিতে না পারলে গবাদি পশুগুলোর ওজন কমবে। কোরবানির পশুগুলোর ওজন কমলে কৃষক ও খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, সংকট মোকাবিলার জন্য খামার মালিকদের বিকল্প নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গো-খাদ্যের জন্য ১ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই তা বণ্টন করা হবে।’
