বন্ড সুবিধার অরাজকতা ঠেকাইতে হইবে

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ২১:২১

কোনো বস্তুতে পচন ধরিলে তাহাতে সুগন্ধি ছিটাইয়া দিলেও উহা শেষাবধি দুর্গন্ধে পরিণত হয়। সমাজের বিষয়টিও তাই। একটি সমাজে অন্যায়-অপরাধ সর্বস্তরে ছড়াইয়া পড়িলে সেইখানে মহতী উদ্যোগও কলুষিত হইয়া উঠে। ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সরকার প্রদত্ত বন্ড সুবিধা। আক্ষরিক অর্থেই ইহা ছিল সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ। ইংরেজি বন্ড শব্দটির অর্থ হইল অঙ্গীকার, লিখিত প্রতিশ্রুতি বা ইকরার নামা। অথচ এই সুবিধা লইয়াই ভঙ্গ হইতেছে প্রতিশ্রুতি। সরকার দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে, বিশেষ করিয়া রপ্তানিমুখী উত্পাদনে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে সুবিধা দিয়া থাকে। নিয়ম হইল উত্পাদনে ঐ কাঁচামাল শতভাগ ব্যবহার করিয়া তাহা আবার রপ্তানি করিতে হইবে। কিন্তু অসংখ্য প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানি করিয়া তাহা অন্যত্র বিক্রয় বা ব্যবহার করিতেছে। পরিণতিতে এই অসত্ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলি কাঁচা পয়সার মুখ দেখিতেছে এবং সরকার বঞ্চিত হইতেছে রাজস্ব আয় হইতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এই সুবিধা কাহাদের হাতে গিয়া পড়িয়াছে? কাহাদের হাত দিয়াই-বা ইহার দেখভাল চলিতেছে?  এইসব লাইসেন্স গ্রহণকারীদের বেশিরভাগই নিয়মনীতির বাহির দিয়া চলিতেছে। 

এইখানেই শেষ নহে। এহেন দুষ্কর্ম করিতে লওয়া হইয়াছে কয়েক হাজার ভুয়া লাইসেন্স! জ্ঞাতব্য, বন্ড কমিশনারেট হইতে মোট ৬ হাজার ৮১৩টি লাইসেন্স ইস্যু করা হইয়াছে। পত্রিকান্তরে সংবাদ প্রকাশ পাইয়াছে, বন্ড সুবিধা গ্রহণের অসত্ উদ্দেশে ভুয়া ও অস্ত্তিত্বহীন কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান রপ্তানির উদ্দেশ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনস্থ ঢাকার বন্ড কমিশনারেট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ করিলেও এইসব কোম্পানির রপ্তানিমুখী কোনো কারখানাই নাই! ভুইফোঁড় এইসব প্রতিষ্ঠান সরাসরি পণ্যরপ্তানির সঙ্গে জড়িত না থাকিয়াও বেনামে লাইসেন্স ব্যবহার করিয়া শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করিয়া দেশের খোলাবাজারে বিক্রয় করিতেছেন। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের খোঁজ লইতে গিয়া গোয়েন্দারা লাইসেন্সে ব্যবহূত নাম ঠিকানার অস্তিত্বই খুঁজিয়া পান নাই!  স্বভাবতই যে কাহারো তর্জনী প্রথমে উঠিবে বন্ড কমিশনারেটের দিকে। নিয়মানুযায়ী লাইসেন্স ইস্যু কর্তৃপক্ষ মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনের জন্য কমিটি গঠন করিয়া থাকে। ঐ কমিটির রিপোর্টের উপর ভিত্তি করিয়াই লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হয়। পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এবং কাঁচামালের ব্যবহার যাচাই করিতে হয়। কী করিয়া ঐসব প্রতিষ্ঠান, যাহাদের প্রদর্শিত স্থানে কোনো নাম-ঠিকানাই নাই, তাহারা লাইসেন্সের অনুমোদন পান উহা জলবত্ তরলং পরিষ্কার। সুতরাং সর্বাগ্রে গোড়াঘর ঠিক করিতে হইবে। এই প্রতিষ্ঠান যেন সততার সঙ্গে লাইসেন্স ইস্যু করে, ভুয়া লাইসেন্সধারীদের লাইসেন্স বাতিল করে এবং বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক নিয়ম মানিতেছে কি না, তা দেখভাল করে—তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। আর সেই কাজটি করিতে হইবে অভিভাবক এনবিআরকে। এখনো সময় আছে ঘুরিয়া দাঁড়াইবার। কেবল সরকারের রাজস্ব বঞ্চিত হওয়াই নহে, যাহারা সততার সঙ্গে এই বন্ড সুবিধা গ্রহণ করিয়া ব্যবসা করিতে চাহিতেছেন, তাহাদের রক্ষা করাও একটি দায়িত্বশীল সরকারের একান্ত দায়িত্ব বলিয়া আমরা মনে করি।