আমরা কোথায় আছি? কেমন আছি? নিজেকে কখনো জিজ্ঞেস করে দেখেছি কি? পুরোনো দিনের একটা প্রবাদ আছে, ‘চিলে কান নিয়ে গেল’—এই কথাটা শুনে একদল মানুষ থাকবে যারা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই চিলের পেছনে দৌড়ানো শুরু করে দেবে, আরেক দল মানুষ থাকবে যারা আগে নিজের কানে হাত দিয়ে দেখবে যে কান অক্ষত আছে কিনা! ইদানিংকালের কিছু কিছু ঘটনায় বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্যি যে প্রথম দলের মানুষগুলোই আমাদের দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠি। বাড্ডার স্কুলে সেই মায়ের গণপিটুনিতে মৃত্যুর খবর যেন পুরো দেশের মানুষকেই নাড়া দিয়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে তো কম হা-হুতাশ হচ্ছে না, আমাদের এইসব আবেগ বা বিবেকবোধ কি শুধু যান্ত্রিক যোগাযোগ মাধ্যমেই আটকে গেছে? একটা সামান্য গুজবে কান দিয়ে এমনভাবেই তাকে পেটানো হলো যে শেষ পর্যন্ত তাকে সেখানেই প্রাণত্যাগ করতে হলো, ভিডিওচিত্রটা যতবার দেখছি আঁতকে উঠতে বাধ্য হচ্ছি।
আচ্ছা একটু ভাবুন, ধরে নিলাম যদি সেই নারী সত্যিই ছেলেধরা হয়েও থাকতেন, তার জন্য কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল না? আইনকে নিজের হাতে কেনই বা তুলে নিতে হলো? এতগুলো মানুষ কেনই বা বারংবার তাকে আঘাত করছিলেন? কি সুখ পাচ্ছিলেন আঘাত করে? তাকে আঘাত করার সময় কারোই কি একটিবারের জন্য বিবেকবোধ কাজ করেনি? তাহলে প্রশ্নটা তো করতেই হচ্ছে... আমাদের বিবেক কি তাহলে মরে গেছে? দেশের আইনশৃঙ্খলা বা বিচার, আদালত, এসবের ওপর কি আদৌ আমাদের কোনো বিশ্বাস আছে? নাকি সবটাই শেষ?
বিচারবহির্ভূত যে-কোনো ধরনের হত্যাকে জনগণ দেখছে আনন্দের দৃষ্টিতে, আইন নিজ হাতে তুলে নিতে পারলে তবেই কিনা জনগণ সন্তুষ্ট থাকছে। যে-কোনো খবরের সত্যতা নিরূপণের পেছনে যেন কারোই কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। একজন মানুষ রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকলে তাকে বাঁচানোর জন্য কজন এগিয়ে আসে? আর কাউকে গণপিটুনি দিতে দেখলে কজন এগিয়ে যায়? আমরা কি তবে ঠিক এখানেই আমাদের বিবেক হারাতে বসেছি?
ভালো কাজের দিকে ধাবিত না হয়ে ধাবিত হচ্ছি সেখানে, যেখানে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের সকল রাগ, অভিমান ঝাড়তে পারছি। একটু ভেবে দেখা যাক, যে লোকগুলো সেই মহিলাটিকে বারংবার আঘাত করে গেল, তাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে। সেই ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত রাগ, হিংসা, বিদ্বেষ তারা ঝেড়ে গেল সেই নিরীহ মহিলাটির ওপর। আচ্ছা এভাবে কতদিন? রাস্তাঘাটে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করব কোন্ সাহসে? আজ একজন গুজবের স্বীকার হয়েছেন, কাল বা পরশু আপনি বা আমিও যে এমন কোনো গুজবের শিকার হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবো না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? আইনের প্রতি অনাস্থা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ভাবতে পারেন? সরকারের বা প্রশাসনের জন্য ভবিষ্যতে যে আরো বড়ো কী কী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে ভাবলেই শিউরে উঠছি। এদেশের জনগণের মনে আইনশৃঙ্খলার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা যদি ফিরিয়ে না আনা যায় তবে এই ধরনের ঘটনা প্রায় প্রত্যেক দিনই ঘটতে থাকবে।
নিজ হাতে আইন তুলে নেওয়ার হার ধীরে ধীরে একেবারে নিয়ন্ত্রণসীমার বাইরে চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। তখন বোধকরি বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার মানুষটাও হয়ত থাকবে না। তাই আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রাখতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অন্যায়। এ কথাটি বুঝতে হবে সবাইকে।
n শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
